শান্তিচুক্তি নাকি আরও বড় যুদ্ধ? নেতানিয়াহুর একরোখা জিদে কি এবার ইজরায়েলের হাত ছাড়ছে আমেরিকা?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন এবং তেল আভিভের বন্ধুত্বকে অলঙ্ঘনীয় বলে মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে এক নজিরবিহীন ফাটলের। গাজা ও লেবানন সীমান্তে স্থায়ী শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল কি তবে এবার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে? হোয়াইট হাউসের যুদ্ধবিরতির খসড়া প্রস্তাবকে যেভাবে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন, তাতে মার্কিন কূটনীতিবিদদের অন্দরেই এখন বড় প্রশ্ন— আমেরিকা আর ইজরায়েল কি এবার সত্যিই উল্টো পথে হাঁটতে চলেছে?

ট্রাম্পের শান্তিচুক্তি বনাম নেতানিয়াহুর ‘চূড়ান্ত জয়’

হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত যুদ্ধ থামানোর এবং একটি মেগা শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছেন। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য, সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের দেশগুলির সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং অঞ্চলটিতে মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।

কিন্তু আমেরিকার এই শান্তি-বার্তার উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর অতি-ডানপন্থী মন্ত্রিসভা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হামাস ও হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তি সম্ভব নয়।

কোথায় তৈরি হচ্ছে মূল মতবিরোধ?

আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটন এবং তেল আভিভের মধ্যে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে:

  • দ্বি-রাষ্ট্র নীতি (Two-State Solution): আমেরিকা যেখানে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে সওয়াল করছে, ইজরায়েল সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

  • ইরান সীমান্ত নিয়ে রণকৌশল: ট্রাম্প প্রশাসন যখন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে কোণঠাসা করতে চায়, ইজরায়েল তখন তেহরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলিতে সরাসরি সামরিক হামলার পক্ষে সওয়াল করছে।

  • গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ: যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক শান্তি বাহিনীর হাতে ছাড়তে নারাজ ইজরায়েলি সেনা, যা মার্কিন পরিকল্পনার সম্পূর্ণ বিরোধী।

মার্কিন প্রতিরক্ষা মহলের হুঁশিয়ারি: ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্কদের মতে, ইজরায়েল যদি মার্কিন প্রস্তাবকে এভাবে লাগাতার উপেক্ষা করতে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইজরায়েলকে কূটনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া এবং কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র সরবরাহ বজায় রাখা আমেরিকার পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়বে।

বন্ধুর হাত কি সত্যিই ছাড়বে আমেরিকা?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই বৈরিতা আসলে এক ধরণের ‘কূটনৈতিক নাটক’ বা রণকৌশলও হতে পারে। মুখে উল্টো পথে হাঁটার কথা বললেও, পর্দার আড়ালে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং মোসাদ (Mossad) একযোগেই কাজ করছে। তবে নেতানিয়াহুর এই একরোখা মনোভাব যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করে, তবে হোয়াইট হাউস যে ইজরায়েলের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক বা সামরিক রাশ টানতে দুবার ভাববে না— তা বলাই বাহুল্য। মধ্যপ্রাচ্য শেষ পর্যন্ত শান্তির আলো দেখবে নাকি আরও এক প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধের দিকে এগোবে, তা এখন এই দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের সমীকরণের ওপরই নির্ভর করছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy