ভারতের বিতর্কিত ব্রিটিশ আমলের রাষ্ট্রদ্রোহিতা আইন বা আইপিসি ১২৪এ (Section 124A IPC) ধারা নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় স্পষ্টীকরণ দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যদি কোনো অভিযুক্তের আপত্তি না থাকে (No Objection), তবে নিম্ন আদালত বা হাইকোর্টগুলি তাঁর বিরুদ্ধে থাকা রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলার বিচার প্রক্রিয়া বা আপিলের শুনানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চালীর ডিভিশন বেঞ্চের এই নির্দেশ দেশজুড়ে ঝুলে থাকা শত শত মামলার ক্ষেত্রে এক বড়সড় আইনি মোড় এনে দিল।
কেন দিতে হলো এই স্পষ্টীকরণ? ৪ বছরের জট কাটল
প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট ‘এস জি ভোম্বাতকেরে বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলায় এক ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ জারি করেছিল। সেই নির্দেশে দেশের প্রাচীন রাষ্ট্রদ্রোহিতা আইনের কার্যকারিতা স্থগিত (Abeyance) রাখার পাশাপাশি এই ধারার অধীনে থাকা সমস্ত এফআইআর, তদন্ত এবং আদালতের বিচার প্রক্রিয়া থমকে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এর ফলে তৈরি হয় এক নতুন আইনি জটিলতা। অনেক অভিযুক্ত, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে জেলে বন্দি ছিলেন বা যাঁদের আপিল মামলা হাইকোর্টে আটকে ছিল, সুপ্রিম কোর্টের ওই স্থগিতাদেশের কারণে তাঁদের মামলাগুলির কোনো নিষ্পত্তি হচ্ছিল না। সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে ১৭ বছর ধরে ঝুলে থাকা এক অভিযুক্তের মামলার প্রেক্ষিতেই সুপ্রিম কোর্ট এই নতুন ও জরুরি ব্যাখ্যা দিল।
সুপ্রিম কোর্টের নতুন রায়ের মূল নির্যাস:
মহামান্য আদালত তাদের ২০২২ সালের নির্দেশের ‘প্যারা ৮(ডি)’-র ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছে:
সম্মতির ভিত্তিতে বিচার: যদি চার্জশিট বা আপিল মামলায় ১২৪এ ধারা থাকে এবং অভিযুক্ত নিজে চান যে তাঁর মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হোক, তবে আদালত সেই মামলার শুনানি সম্পূর্ণ করতে পারবে।
বিচারে কোনো বাধা নেই: অভিযুক্তের সম্মতি থাকলে দেশের যেকোনো আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা বা আইনি প্রক্রিয়া সচল রাখতে পারবে, সেখানে পূর্ববর্তী স্থগিতাদেশ কোনো বাধা (Impediment) সৃষ্টি করবে না।
মেধার ভিত্তিতে রায়: সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে, তারা মামলার গুনাগুণ বা মেধার (Merits) ওপর কোনো মন্তব্য করছে না, স্রেফ ঝুলে থাকা মামলা নিষ্পত্তির পথ প্রশস্ত করছে।
আইনজ্ঞদের মতামত: আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। এর ফলে বহু নির্দোষ ব্যক্তি, যাঁরা স্রেফ স্থগিতাদেশের কারণে বছরের পর বছর আইনি জটিলতায় ফেঁসে ছিলেন, তাঁরা এবার নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগ পাবেন। একই সাথে এটি দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর চেপে থাকা ঝুলে থাকা মামলার বোঝাও কিছুটা হালকা করবে।
কেন্দ্রীয় সরকার যেখানে দীর্ঘদিন ধরে এই ঔপনিবেশিক আইনের পুনর্বিবেচনা করছে, সেখানে সুপ্রিম কোর্টের এই সময়োপযোগী স্পষ্টীকরণ বিচারপ্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে এবং বন্দিদের মানবাধিকার রক্ষায় এক বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।





