রেলে ১ লক্ষ কোটির বিনিয়োগের জোয়ার! নবান্নে বৈঠক শেষে বাংলায় বড় প্রকল্পের ঘোষণা রেলমন্ত্রীর

রাজ্যে পালাবদলের পর কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। শুক্রবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক রাজ্যের রেল পরিকাঠামো উন্নয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পর এটিই ছিল রেলমন্ত্রীর প্রথম পশ্চিমবঙ্গ সফর। দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা প্রকল্প ও নতুন পরিকাঠামোগত পরিকল্পনা নিয়ে এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।

বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানান, “রেলমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে যে ‘যুদ্ধ যুদ্ধ’ মনোভাব ছিল, তার ফলে বাংলার মানুষ রেলের বড় উন্নয়ন থেকে দীর্ঘকাল বঞ্চিত ছিল। তবে বর্তমান ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের আমলে সেই বঞ্চনার দিন শেষ হতে চলেছে। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবও আগের সরকারের সমালোচনা করে বিশেষ করে চিংড়িঘাটা মেট্রো প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার ওপর জোর দেন।

এই বৈঠকের মূল আকর্ষণ ছিল রাজ্যে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি রেল প্রকল্প রূপায়ণের ঘোষণা। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে রাজ্যে ১০২টি অমৃত ভারত স্টেশনকে অত্যাধুনিক করে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি ৫৩৮টি নতুন আন্ডারপাস ও উড়ালপুল নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু হবে, যা শহরতলি ও দূরপাল্লার যাতায়াত ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। মেট্রো সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যাতে কলকাতার যানজট পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটে।

সবচেয়ে বড় বাধা ছিল জমি অধিগ্রহণ। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আগে এই জমি সংক্রান্ত জটই অধিকাংশ রেল প্রকল্পকে আটকে রেখেছিল। কিন্তু এবার রাজ্য সরকার রেলের পাশে দাঁড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বিএসএফ-কে যেভাবে সীমান্ত সুরক্ষার জন্য জমি দেওয়া হয়েছে, রেলের মেগা মিশনগুলোর জন্য রাজ্য সরকার একইভাবে দ্রুত জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।” ইতিমধ্যেই রেলকে ৪০টিরও বেশি এনওসি (NOC) প্রদান করা হয়েছে। রাজ্য সরকার রেলওয়ে বোর্ডের জন্য একটি নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার তৈরি করবে, যেখানে কোন প্রকল্পের জন্য কতটুকু জমি প্রয়োজন তা চিহ্নিত করে দ্রুত অধিগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

এই প্রকল্পের পরিধি উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে জঙ্গলমহল এবং দক্ষিণবঙ্গের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এতদিন যেসব এলাকা রেল মানচিত্রের বাইরে ছিল, তাদের এবার মূল ধারায় আনা হবে। এই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথভাবে কাজ করবে বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি। অদূর ভবিষ্যতেই মুখ্যমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রী স্বয়ং চিংড়িঘাটা মেট্রো প্রকল্প পরিদর্শনে যাবেন, যা এই কাজের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

পরিশেষে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বৈঠক কেবল প্রশাসনিক উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয় না, বরং কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে এক নতুন বন্ধুত্বের বার্তাও বহন করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রেল উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতি আস্থা রেখে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন যে, বাংলার মানুষের জন্য ডাবল ইঞ্জিন সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। সব মিলিয়ে নবান্নের এই বৈঠকের পর বাংলার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বড় বিনিয়োগ ও দ্রুত রূপান্তরের পথ প্রশস্ত হলো।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy