ভারতীয় রেলের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। লক্ষ লক্ষ দৈনিক যাত্রীদের দীর্ঘদিনের এক সাহসী স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এক অবিশ্বাস্য পদক্ষেপ গ্রহণ করল পূর্ব রেল। এবার থেকে রেলস্টেশন চত্বরে কোনও আবর্জনা বা নোংরা চোখে পড়লে, তা রিপোর্ট করার মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পরিষ্কার করার আনুষ্ঠানিক গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে। পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজার শ্রী মিলিন্দ দেওস্কর ঐতিহাসিক শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশনে উপস্থিত থেকে ‘স্বচ্ছতা অভিযান’-এর এই বহুল প্রতীক্ষিত ও হাইপ্রোফাইল দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা করবেন। আগামী ৩০ মে পর্যন্ত চলা এই বিশেষ মেগা-অভিযানটি কেবল একটি সাধারণ রুটিন কর্মসূচি নয়, বরং রেল পরিষেবার আধুনিকীকরণ এবং রিয়েল-টাইম হাইজিন (Real-time Hygiene) বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন। শিয়ালদহে মূল অনুষ্ঠানটি চলাকালীন সমান্তরালভাবে হাওড়া স্টেশনেও একই উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হবে, যেখানে অতিরিক্ত জেনারেল ম্যানেজার শ্রী শীলেন্দ্র প্রতাপ সিং এই কর্মসূচির নেতৃত্ব দেবেন। প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের কাছে এটি রেলের এক অকাট্য প্রতিশ্রুতি যে, তাদের রেল সফর এখন থেকে আরও উন্নত, নিরাপদ ও ঝকঝকে হতে চলেছে।
এই উদ্যোগটি যাত্রী পরিষেবার ক্ষেত্রে এক বিশাল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, যেখানে হাই-টেক রিপোর্টিং সিস্টেমের সঙ্গে একনিষ্ঠ রেল কর্মীদের নিখুঁত সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। ‘স্পট ইট, রিপোর্ট ইট, উই আর অন ইট’ (Spot it, Report it, We are on it)—এই অনুপ্রেরণামূলক স্লোগানকে সামনে রেখে পূর্ব রেল প্রতিটি যাত্রীকে তাদের সফরের পরিচ্ছন্নতায় সরাসরি অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। এর সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ ও চমকপ্রদ। যদি কোনও যাত্রী স্টেশন চত্বরের কোথাও আবর্জনা দেখতে পান, তবে তাঁদের সেই নোংরা জায়গার একটি স্পষ্ট ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলগুলিকে—যেমন শিয়ালদহের জন্য @drmsdah, হাওড়ার জন্য @drmhowrah, মালদার জন্য @drmmalda, অথবা আসানসোলের জন্য @DrmAsansol—ট্যাগ করে এবং #ERChallenge হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে যাত্রীরা তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারেন। এছাড়া ফেসবুক বা রেলমদদ (Railmadad) অ্যাপের মাধ্যমেও এই লাইভ রিপোর্ট করা যাবে। আর রিপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব রেলের বিশেষ ‘ক্লিনিং স্কোয়াড’ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে সেই নির্দিষ্ট স্থানটি পরিষ্কার করতে বাধ্য থাকবে। যদিও এই ৩০ মিনিটের গ্যারান্টি শিয়ালদহ, হাওড়া, মালদা এবং আসানসোল ডিভিশনের প্রতিটি স্টেশনের জন্যই প্রযোজ্য, তবে উদ্বোধনী দিনটিতে ১৫টি অতি-গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে এই নিয়ম বিশেষভাবে বলবৎ করা হচ্ছে।
আগামীকালের এই উদ্বোধনী কর্মসূচির ব্যাপ্তি নজিরবিহীন, যেখানে পূর্ব রেলের ৪টি ডিভিশনের ১৫টি কৌশলগত স্টেশনে একযোগে এই চ্যালেঞ্জ শুরু হবে। শিয়ালদহ ডিভিশনে এই অভিযানের সূচনা হবে শিয়ালদহ, দমদম জংশন, ব্যারাকপুর, নৈহাটি, কাঁচরাপাড়া এবং বারাসত স্টেশনে। হাওড়া ডিভিশনে হাওড়া, লিলুয়া, ব্যান্ডেল জংশন এবং রামপুরহাট স্টেশনে এই অভিযান চলবে। আসানসোল ডিভিশনে আসানসোল ও দুর্গাপুরের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হবে এবং মালদা ডিভিশনে মালদা, জামালপুর ও ভাগলপুর স্টেশনকে এই মেগা তালিকায় রাখা হয়েছে। পূর্ব রেলের প্রতিটি বিভাগকে এই মিশনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে যাতে ২৪ ঘণ্টা অবিরাম নজরদারি বজায় থাকে। বিভাগীয় প্রধান এবং কর্মীদের মধ্যে এই নিচ্ছিদ্র সমন্বয় নিশ্চিত করবে যে, কোনও যাত্রী বড় জংশনে থাকুন বা ছোট কোনও হল্ট স্টেশনে—পরিচ্ছন্নতার মান সব জায়গাতেই পেশাদার এবং আপসহীন থাকবে।
এই অভিনব উদ্যোগের আবেগঘন ও মানবিক দিকের কথা তুলে ধরে পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক (CPRO) শ্রী শিবরাম মাঝি জানান যে, রেলওয়ে এই স্টেশনগুলিকে কেবল ইট-কাঠ-পাথরের পরিকাঠামো হিসেবে দেখে না, প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে যাতায়াত করেন, তাঁদের কাছে এগুলি আসলে একটি ‘দ্বিতীয় বাড়ি’। তিনি বলেন, “আমাদের নিজেদের বসার ঘরের মতো এই স্টেশন চত্বরগুলিকেও সমান যত্ন, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পরিষ্কার রাখা উচিত।” শ্রী মাঝি আরও উল্লেখ করেন যে, রেল কর্তৃপক্ষ ৩০ মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য নিজেদের সমস্ত আধুনিক শক্তি ও জনবল নিয়োগ করলেও, এই কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতার ওপর। তিনি যাত্রীদের যেখানে-সেখানে আবর্জনা না ফেলার অনুরোধ জানান এবং নিজেদের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে আহ্বান জানান। তিনি পরিশেষে বলেন যে, একটি সুন্দর, সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন আগামী আমাদের সকলের যৌথ সামাজিক দায়িত্ব এবং #ERChallenge-এর মাধ্যমে এখন প্রতিটি সাধারণ যাত্রীর হাতেই সিস্টেম পরিবর্তনের আসল চাবিকাঠি রয়েছে।





