স্কুল বা কলেজের একটি সাধারণ রিপোর্ট কার্ড কি কোনো মানুষের ভবিষ্যৎ বা মেধা নির্ধারণ করতে পারে? বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক যুগে যেখানে সামান্য নম্বর কম পেলেই ছাত্রছাত্রীরা চরম হতাশায় ডুবে যায়, সেখানে এই ধারণা ভাঙার এক জীবন্ত রূপকথা তৈরি করেছেন আইপিএস (IPS) অফিসার সমীর শর্মা। যাঁকে একসময় শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে ‘ব্যর্থ’ বলে দেগে দেওয়া হয়েছিল, নিজের অদম্য সংকল্প, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির জোরে আজ তিনি সাফল্যের এক অনন্য শিখরে। স্কুল-কলেজের দুর্বলতম ছাত্র থেকে দেশের অন্যতম কঠিন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাস করে আইপিএস হওয়ার এই রোমহর্ষক সফর আজ সমাজমাধ্যমে ভাইরাল এবং লক্ষাধিক UPSC পরীক্ষার্থীর জন্য এক পরম অনুপ্রেরণা।
সমীর শর্মার শিক্ষাজীবনের খতিয়ান দেখলে যেকোনো সাধারণ মানুষ তাঁর কেরিয়ার নিয়ে আশা ছেড়ে দেবেন। তিনি দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় পেয়েছিলেন মাত্র ৫৭ শতাংশ নম্বর। একাদশ শ্রেণিতে সেই গ্রাফ আরও নেমে গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৩৪ শতাংশে। এরপর দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় কোনোমতে ৬০ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাস করেন তিনি। স্কুলজীবনের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর সমীর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কলেজ জীবনেও তাঁর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পড়াশোনায় মনোযোগের অভাব এবং ক্রমাগত গাফিলতির কারণে বি.টেক (B.Tech) পড়ার সময় তাঁর ঝুলিতে জমা হয় একে একে ২৪টি বিষয়ের ব্যাকলগ (ফেল)!
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ২৪টি বিষয়ে ফেল করার মতো চরম বিপর্যয় যেকোনো তরুণকে মানসিক অবসাদের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। সমীরও সাময়িকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন, কিন্তু তিনি হার মানেননি। সমস্ত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে কোনোক্রমে বি.টেক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেন। ভারতের সবচেয়ে কঠিন এবং মর্যাদাপূর্ণ পরীক্ষা ‘ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস’ (UPSC CSE)-এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যেখানে প্রতি বছর দেশের সেরা আইআইটি (IIT) বা আইআইএম (IIM)-এর টপাররা লড়াই করেন, সেখানে ২৪টি ব্যাকলগ থাকা এক যুবকের এই সিদ্ধান্ত ছিল একপ্রকার অসম লড়াইয়ের শামিল।
কিন্তু সমীর নিজেকে প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। তিনি নিজের মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা এবং ব্যর্থতার তকমা মুছে ফেলে সম্পূর্ণ ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে ময়দানে নামেন। নিজেকে কখনো কোনো আইআইটি বা আইআইএম-এর কৃতী ছাত্রের চেয়ে কম যোগ্য বা নিকৃষ্ট মনে করেননি তিনি। কোনো মানসিক চাপ না নিয়ে, কোনো তুলনার বেড়াজালে নিজেকে না বাঁধিয়ে, তিনি কেবল পূর্ণ নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে পড়াশোনা শুরু করেন। টানা ১৮ মাস সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে কঠোর অধ্যবসায়ের সাথে প্রস্তুতি চালিয়ে যান সমীর। আর সেই ১৮ মাসের রুদ্ধশ্বাস তপস্যার ফল আসে এক জাদুকরী সাফল্যে।
২০১১ সালের ইউপিএসসি পরীক্ষায় দেশজুড়ে ১৮২তম র্যাঙ্ক (AIR 182) অর্জন করে সবাইকে চমকে দেন সমীর শর্মা। তিনি এজিএমইউটি (AGMUT) ক্যাডারের ২০১১ ব্যাচের একজন আইপিএস অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর এই অবিশ্বাস্য পথচলা প্রমাণ করে দেয় যে, জীবনে সফল হওয়ার জন্য অতীতের কোনো দুর্দান্ত অ্যাকাডেমিক রেকর্ডের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় শুধু একটি লড়াকু মানসিকতার। যেখানে আজ সামান্য ব্যর্থতাতেই যুবসমাজ দিশেহারা হয়ে পড়ে, সেখানে আইপিএস সমীর শর্মা লাখো যুবকের কাছে এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত যে, সংকল্প দৃঢ় থাকলে ভাগ্যের চাকা যেকোনো সময় ঘোরানো সম্ভব।





