সোশ্যাল মিডিয়ার রিল ভিডিওর দুনিয়া যে কতটা ভয়ঙ্কর এবং প্রতারণায় ভরা হতে পারে, তার এক নির্মম উদাহরণ সামনে এল বিহারের পূর্ব চম্পারণ জেলার রক্সাউলে। এক তরুণীকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে, নিজের ধর্ম ও আসল নাম গোপন করে দিনের পর দিন যৌন শোষণ এবং গর্ভবতী করার পর নির্মমভাবে পরিত্যাগ করার অভিযোগ উঠল এক যুবকের বিরুদ্ধে। এখানেই শেষ নয়, ওই তরুণীর অজান্তেই তাঁর নাম ও ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়ার জন্য একটি জাল আধার কার্ড তৈরি করার মতো মারাত্মক জালিয়াতির ঘটনাও সামনে এসেছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা বিহার জুড়ে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত যুবকের আসল নাম হাসরে আলম। সে আদাপুর ব্লকের কাচুরওয়াড়ি গ্রামের বাসিন্দা। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য একটি রিল ভিডিওর শুটিংকে কেন্দ্র করে। শুটিং চলাকালীনই সঙ্গীতা পাসওয়ান নামে এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয় হাসরে আলমের। অভিযোগ, নিজের মুসলিম পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন করে নিজেকে ‘রাজ’ নামে এক হিন্দু যুবক হিসেবে তরুণীর কাছে পরিচয় দেয় সে। সঙ্গীতার বিশ্বাস অর্জন করতে এবং নিজেকে খাঁটি হিন্দু হিসেবে জাহির করতে হাসরে আলম সমস্ত রকম ভান করত। এমনকি তরুণীকে নিয়ে বিহার থেকে নেপালের বিখ্যাত জনকপুর মন্দিরে গিয়ে পুজোও দিয়ে আসে সে। ‘রাজ’-এর এই আচরণে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে তাঁর প্রেমের ফাঁদে সম্পূর্ণ জড়িয়ে পড়েন সঙ্গীতা।
এরপরই শুরু হয় আসল জালিয়াতির খেলা। সঙ্গীতা পাসওয়ানের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ বদলে ফেলার চক্রান্ত করে অভিযুক্ত। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সঙ্গীতার একটি ভুয়ো আধার কার্ড তৈরি করা হয়, যেখানে তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সানিয়া খাতুন’। এই জাল পরিচয়পত্রটি ব্যবহার করেই তরুণীকে নিজের হেফাজতে রাখে হাসরে আলম এবং দিনের পর দিন তাঁর ওপর চলে তীব্র যৌন নির্যাতন।
কিছুদিন পর ওই তরুণী গর্ভবতী হয়ে পড়লে গল্পের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। তরুণী যখন বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন, তখন হঠাৎই নিজের আসল রূপ ধারণ করে ‘রাজ’। সে সঙ্গীতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে সে কোনো হিন্দু যুবক নয়, বরং তার আসল নাম হাসরে আলম এবং সে আগে থেকেই বিবাহিত। এই চরম সত্য জানতে পেরে যখন তরুণীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, তখন তাঁর ওপর শুরু হয় মানসিক ও ধর্মীয় নিপীড়ন। অভিযোগ, ভুক্তভোগী তরুণীকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে এবং রোজা ও নামাজ পড়ার জন্য চরম চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু সঙ্গীতা নিজের ধর্ম ছাড়তে এবং এই জঘন্য অন্যায়ের মুখে মাথা নত করতে অস্বীকার করায়, গর্ভবতী অবস্থাতেই তাকে রাস্তায় ফেলে চম্পট দেয় অভিযুক্ত হাসরে আলম।
বর্তমানে অসহায় ও গর্ভবতী ওই তরুণী রক্সাউলের ‘স্বচ্ছ রক্সাউল সংস্থা’ দ্বারা পরিচালিত একটি সরকারি নারী আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানেই ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা ও দেখাশোনা চলছে। এই নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনা প্রসঙ্গে ‘স্বচ্ছ রক্সাউল সংস্থা’-র পরিচালক রঞ্জিত সিং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, “ওই তরুণীর সঙ্গে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত অন্যায় এবং অমানবিক। বর্তমান যুগের মেয়েদের কোনো সম্পর্কে জড়ানোর আগে বা কাউকে বিশ্বাস করার আগে সেই ব্যক্তির পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি।”
সংস্থার সহ-পরিচালক শাবরা খাতুনও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন, “প্রেমের সম্পর্কের মতো একটি পবিত্র বিষয়ের নামে মিথ্যা বলা, নিজের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে জালিয়াতি করা অত্যন্ত বড় অপরাধ। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি যাতে অভিযুক্ত হাসরে আলমের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং নির্যাতিতা যেন দ্রুত বিচার পান।” এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং পুলিশ ঘটনার তদন্তে নেমেছে।





