কন্যাসন্তানের সুরক্ষিত ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে কেন্দ্র সরকারের ‘সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা’ (SSY)-কে অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাজারের অন্যান্য স্কিমের তুলনায় আকর্ষণীয় সুদের হার এবং এর সঙ্গে যুক্ত কর ছাড়ের (Tax Benefit) সুবিধা একে আমজনতার কাছে অত্যন্ত লাভজনক করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ এটিকে ‘লক অ্যান্ড ফরগেট’ (বিনিয়োগ করো আর ভুলে যাও) স্কিম বলেন, কারণ নিয়ম অনুযায়ী অ্যাকাউন্টটি ২১ বছর পর সম্পূর্ণ ম্যাচিওর বা মেয়াদপূর্তিতে পৌঁছয়।
কিন্তু জীবন সবসময় চেনা ছকে চলে না। অনেক সময় মেয়ের উচ্চশিক্ষা, বিয়ে কিংবা আচমকা কোনও জরুরি প্রয়োজনে ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মোটা অঙ্কের টাকার প্রয়োজন পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনার টাকা কি মেয়াদপূর্তির আগে তোলা সম্ভব? উত্তর হলো— হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব। তবে এর জন্য ভারত সরকারের কিছু অত্যন্ত কঠোর ও নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে।
মেয়ের বয়স ১৮ হলেই মিলবে আংশিক টাকা
সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনার সরকারি নিয়ম অনুসারে, আপনার মেয়ের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত আপনি এই অ্যাকাউন্ট থেকে কোনও টাকা তুলতে পারবেন না। তবে মেয়ের বয়স ১৮ বছর পার হলেই উচ্চশিক্ষার জন্য আংশিক টাকা তোলার একটি বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়।
কত টাকা তোলা যাবে: নিয়ম অনুযায়ী, আপনি আপনার সুকন্যা অ্যাকাউন্টে জমে থাকা মোট ব্যালেন্সের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা তুলতে পারবেন।
হিসাব কীভাবে হবে: আপনি যে বছর আবেদন করছেন, তার আগের আর্থিক বছরের শেষ দিন (৩১শে মার্চ) অ্যাকাউন্টে যে পরিমাণ ক্লোজিং ব্যালেন্স ছিল, তার ওপর ভিত্তি করেই এই ৫০ শতাংশের হিসাব কষা হয়।
কিস্তির সুবিধা: এই টাকা আপনি চাইলে এককালীন (Lump Sum) তুলতে পারেন অথবা আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ বছরের কিস্তিতেও তুলে নিতে পারেন।
টাকা তোলার আসল কারণ কী হতে হবে?
সরকার কিন্তু এই অ্যাকাউন্ট থেকে যথেচ্ছভাবে বা সাধারণ কোনও কারণে টাকা তোলার অনুমতি দেয় না। আংশিক টাকা তোলার একমাত্র প্রধান উদ্দেশ্য হতে হবে মেয়ের উচ্চশিক্ষার খরচ চালানো। এর জন্য আপনাকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অ্যাডমিশন লেটার, কলেজ ফি বা ভর্তি সংক্রান্ত বৈধ নথিপত্র ব্যাঙ্ক অথবা পোস্ট অফিসে জমা দিতে হবে। মনে রাখবেন, সাধারণ কোনও গৃহস্থালি বা ব্যক্তিগত খরচের জন্য এই টাকা ব্যবহার করা যাবে না।
কোন পরিস্থিতিতে অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব?
২১ বছর বয়স হওয়ার আগে অ্যাকাউন্টটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে (Pre-mature Closure) জমানো সব টাকা তুলে নেওয়ার অনুমতি কেবল কিছু বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতিতেই দেওয়া হয়:
১. ১৮ বছরের পর বিয়ে: মেয়ের বয়স ১৮ বছর পার হওয়ার পর যদি তাঁর বিয়ে ঠিক হয়, তবে বিয়ের তারিখের ১ মাস আগে অথবা বিয়ের ৩ মাস পর পর্যন্ত সময়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণ দেখিয়ে অ্যাকাউন্টটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে পুরো টাকা তুলে নেওয়া যায়। ২. অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা: যদি দুর্ভাগ্যবশত অ্যাকাউন্টধারী কন্যাসন্তানের অকাল মৃত্যু হয়, তবে এই খাতাটি অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সুদের হার সহ সম্পূর্ণ অর্থ অভিভাবকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ৩. গুরুতর আর্থিক সঙ্কট: পরিবারে কোনও মারণ রোগ বা গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিলে কিংবা অভিভাবকের মৃত্যু হলে এবং অ্যাকাউন্টটি চালানো আর কোনওভাবেই সম্ভব না হলে, সরকারি দপ্তরের কঠোর ভেরিফিকেশনের পর নির্ধারিত সময়ের আগেই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার বিশেষ অনুমতি মিলতে পারে।
ধাপে ধাপে টাকা তোলার সহজ প্রক্রিয়া
আপনি যদি সমস্ত নিয়ম মেনে ফান্ড উত্তোলনের যোগ্য হন, তবে টাকা তোলার পদ্ধতিটি বেশ সহজ:
ধাপ ১: প্রথমেই সেই নির্দিষ্ট ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিস শাখায় যান, যেখানে আপনার মেয়ের সুকন্যা অ্যাকাউন্টটি খোলা রয়েছে।
ধাপ ২: সেখান থেকে ‘SSY উইথড্রল ফর্ম’ (SSY Withdrawal Form) সংগ্রহ করে সেটি নির্ভুলভাবে পূরণ করুন।
ধাপ ৩: ফর্মের সঙ্গে মেয়ের বয়সের শংসাপত্র এবং উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র (অ্যাডমিশন লেটার বা ফি জমার রসিদ) যুক্ত করুন।
ধাপ ৪: আধিকারিকদের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর, টাকাটি সরাসরি অভিভাবক বা মেয়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে দেওয়া হবে।
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের বিশেষ পরামর্শ
যেহেতু সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় একটি দীর্ঘ ‘লক-ইন পিরিয়ড’ বা সময়সীমা থাকে, তাই আর্থিক বিশেষজ্ঞরা শুধুমাত্র এই একটি স্কিমের ওপর সন্তানের গোটা ভবিষ্যৎ নির্ভর না করার পরামর্শ দিচ্ছেন। মেয়ের স্বল্পমেয়াদী প্রয়োজন, যেমন— প্রতি বছরের স্কুলের ফি বা অন্যান্য বার্ষিক খরচের কথা মাথায় রেখে পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ড, ফিক্সড ডিপোজিট (FD) কিংবা অন্যান্য ফ্লেক্সিবল বা নমনীয় বিনিয়োগের বিকল্পগুলিও চালু রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।





