আঙুর চাষ মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মহারাষ্ট্রের নাসিক কিংবা দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ আঙুর বাগান। পশ্চিমবঙ্গের মাটি বা আবহাওয়ায় মিষ্টি আঙুর ফলানো কার্যত অসম্ভব বলেই মনে করতেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সেই চেনা ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক নজিরবিহীন কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললেন মুর্শিদাবাদের এক ২৫ বছরের যুবক। জেলার হরিহরপাড়ার সলুয়া গ্রামের বাসিন্দা শেহেরুল শেখ নিজের জমিতে থোকা থোকা মিষ্টি আঙুর ফলিয়ে শুধু তাক লাগিয়ে দেননি, বরং বাংলার কৃষকদের জন্য আয়ের এক সম্পূর্ণ নতুন ও লাভজনক দিশা দেখিয়েছেন।
ছাদবাগান থেকে সোজা মাঠের জমিতে ‘আঙুর বিপ্লব’
হরিহরপাড়া অঞ্চলে সাধারণত বছরের পর বছর ধরে প্রথাগতভাবে ধান, পাট, সর্ষে কিংবা কিছু মরশুমি সবজির চাষ হয়ে আসছিল। কিন্তু প্রথাগত চাষের বাইরে গিয়ে কিছু করার জেদ ছিল শেহেরুলের। শুরুটা হয়েছিল শখের ছাদবাগান দিয়ে। সেখানে আঙুরের ফলন ভালো হতেই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় তাঁর। এরপর বন্ধুর কাছ থেকে কয়েক শতক মাঠের জমি লিজ নিয়ে পুরোদমে আধুনিক উপায়ে আঙুর গাছ, বেদানা ও মৌসম্বি লেবুর চাষ শুরু করেন তিনি।
বর্তমানে শেহেরুলের বাগানে প্রতিটি গাছে প্রায় ৬০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত আঙুরের থোকা ঝুলছে। আর সেই আঙুর বাজারে চড়া দামে বিক্রিও হচ্ছে।
সফল তরুণ চাষি শেহেরুল শেখ জানান, “আমি যখন প্রথমে নানা ফলের গাছ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতাম, গ্রামের অনেকেই আমাকে পাগল বলে কটাক্ষ করত। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। এই আঙুরের জাত এত ভালো এবং আমাদের আবহাওয়ার সাথে মানানসই যে, সাধারণ সবজি চাষের মতোই সামান্য পরিচর্যাতেই প্রচুর ফলন পাওয়া যায়। আলাদা করে কোনো দামি সারেরও প্রয়োজন হয় না।”
পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য নতুন আশার আলো
মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার যুবক কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে বা ভিন দেশে পাড়ি দেন। পরিযায়ী শ্রমিকের তকমা ঘোচাতে শেহেরুলের এই ‘গ্রিন ফর্মুলা’ এক ব্রহ্মাস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি না খেটে, বাংলার যুবকেরা যদি নিজেদের সামান্য জমিতেও এভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আঙুর বা দামি ফলের বাগিচা গড়ে তুলতে পারেন, তবে ঘরে বসেই প্রতি মরশুমে লক্ষাধিক টাকা আয় করা সম্ভব।
দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন দূর-দূরান্তের মানুষ
মুর্শিদাবাদের মতো চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া— যেখানে গ্রীষ্মে চড়া রোদ আর শীতে তীব্র ঠান্ডা থাকে, সেখানে এমন রসালো ও মিষ্টি আঙুরের ফলন দেখতে প্রতিদিন শেহেরুলের জমিতে ভিড় জমাচ্ছেন আশেপাশের এলাকার মানুষ। অনেকেই নিজের জমিতে এই চাষ শুরু করার জন্য শেহেরুলের কাছ থেকে চারা এবং পরিচর্যার পরামর্শ নিচ্ছেন। পরীক্ষামূলকভাবে অল্প জমিতে এই বিপুল সাফল্যের পর, আগামী দিনে আরও বড়সড় জমিতে বাণিজ্যিক উপায়ে আঙুর চাষের মহাপরিকল্পনা নিচ্ছেন এই বাংলার কৃতি যুবক।





