পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অলিন্দে বুধবার এক অভাবনীয় রাজনৈতিক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল রাজ্য। গত দু’দিনের তীব্র জল্পনা ও গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে বিধানসভায় ৫৯ জন বিধায়কের সই করা তালিকা নিয়ে প্রবেশ করলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর অনুগামীরা। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে এক বড়সড় বিভাজন ঘটে গিয়েছে এবং আত্মপ্রকাশ ঘটেছে ‘নতুন তৃণমূল’-এর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল ভেঙে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের এই বিদ্রোহ রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ আমূল বদলে দিতে চলেছে।
বিধানসভায় বিদ্রোহী শিবিরের এই শক্তিবৃদ্ধি শাসকদলের অন্দরে বড়সড় ফাটল ধরিয়েছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে উঠে আসা এই ‘নতুন তৃণমূল’ শিবিরে রয়েছেন একাধিক পরিচিত ও প্রভাবশালী মুখ। তালিকার দিকে নজর দিলে দেখা যায়, হাওড়া মধ্যের বিধায়ক অরূপ রায়, ডোমজুড়ের তাপস মাইতি, মহেশতলার শুভাশিস দাস, কুলপির বর্ণালী ধারা, কেশপুরের শিউলি সাহা এবং সামসেরগঞ্জের মহম্মদ নূর আলমের মতো বিধায়করা রয়েছেন এই বিদ্রোহী তালিকায়। এছাড়াও রয়েছেন হরিহরপাড়ার নিয়ামত শেখ, লালগোলার আব্দুল আজিজ, ভগবানগোলার রেয়াত হোসেন, সুতির ইমানি বিশ্বাস, রঘুনাথগঞ্জের আক্রুজ্জামান, খড়্গপুরের দিনেন রায়, সুজাপুরের সাবিনা ইয়াসমিন ও রতুয়ার সমর মুখোপাধ্যায়। তালিকায় নাম রয়েছে রথীন ঘোষ, সন্দীপন সাহা ও চন্দ্রনাথ সিনহার মতো হেভিওয়েট নেতাদেরও। এছাড়া হাওড়া জেলার আরও তিন বিধায়ক, অরুণাভ সেন ও সমীর পাঁজাও এই বিদ্রোহে শামিল হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
বিদ্রোহী শিবিরের এই বিধায়কদের দাবি, তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী হিসেবে স্বীকার করলেও, দলের বর্তমান প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। তারা নিজেদের একটি আলাদা সত্তা হিসেবে তুলে ধরছেন। যদিও পরবর্তী ‘বিরোধী দলনেতা’ কে হবেন, তা নিয়ে আপাতত মুখে কুলুপ এঁটেছেন তারা, তবে রাজনৈতিক মহলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামই এই পদের জন্য জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে বেরিয়ে আসা এই ৫৯ জন বিধায়ক এখন বিধানসভায় নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমেছেন। মমতা-অভিষেক জুটির ক্ষমতার বলয় থেকে বেরিয়ে এসে এই ‘নব তৃণমূল’-এর আত্মপ্রকাশ শাসকদলের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ঘাসফুল প্রতীক কার দখলে থাকবে, তা নিয়ে এখন আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না পর্যবেক্ষকরা। বিধানসভার অধিবেশনে এই বিদ্রোহী বিধায়কদের আচরণ এবং স্পিকারের কাছে তাদের দেওয়া নথিপত্র শাসকদলের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্য রাজনীতির এই নতুন অধ্যায় কোন পথে মোড় নেয়, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।





