বিশ্বজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব চালানো কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (IS)-এর গ্লোবাল নেটওয়ার্কে এবার এক মস্ত বড় এবং মরণোত্তর আঘাত হানল মার্কিন সেনা। সুদূর আফ্রিকার নাইজেরিয়ার মাটিতে এক অত্যন্ত জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অসমসাহসী যৌথ অভিযান চালিয়ে খতম করা হয়েছে আইএসের ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ তথা সংগঠনের মূল আর্থিক মাস্টারমাইন্ড আবু-বিলাল আল-মিনুকিকে। শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই মেগা অপারেশন সফল হওয়ার খবরটি বিশ্ববাসীর সামনে এনেছেন। এই বিশেষ এবং অত্যন্ত গোপনীয় অভিযানে আমেরিকার এলিট কম্যান্ডো ফোর্সের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাঁটাতারের ওপারে লড়াই করেছে নাইজেরিয়ার সশস্ত্র সেনাবাহিনীও।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের চেনা মেজাজেই তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ (Truth Social) এই ঐতিহাসিক সাফল্যের কথা ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্প অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে লিখেছেন, “আজ রাতে আমার সরাসরি নির্দেশে, সাহসী আমেরিকান বিশেষ বাহিনী এবং নাইজেরিয়ার সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় ও বিপজ্জনক সন্ত্রাসবাদীকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে৷ একটি নিখুঁত, নিখাদ ও অত্যন্ত জটিল আন্তর্জাতিক মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে আমাদের বীর সেনারা।” ট্রাম্প তাঁর পোস্টে আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আফ্রিকায় মার্কিন সেনাবাহিনীর নিজস্ব অত্যন্ত বিশ্বস্ত অন-গ্রাউন্ড সোর্স বা গুপ্তচর ছিল, যারা দীর্ঘদিন ধরে আল-মিনুকির প্রতি মুহূর্তের গতিবিধির ওপর ২৪ ঘণ্টা কড়া নজর রাখছিল এবং মোক্ষম সময়েই সবুজ সংকেত দেওয়া হয়।
কে এই আবু-বিলাল আল-মিনুকি, যাকে মারতে এত বড় অপারেশন করতে হলো? গোয়েন্দা সূত্রে খবর, আবু বকর মহম্মদ আল-মাইনিকি নামেও পরিচিত এই কুখ্যাত জঙ্গি মূলত আফ্রিকার সাহেল (Sahel) অঞ্চলে সক্রিয় ছিল এবং সে আইএসের পশ্চিম আফ্রিকা শাখার (ISWAP) অন্যতম শীর্ষ মোস্ট ওয়ান্টেড কমান্ডার ছিল। ২০২৩ সালের জুন মাসে মার্কিন প্রশাসন তাকে ‘স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট’ (SDGT) হিসেবে ঘোষণা করেছিল। আন্তর্জাতিক স্তর থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং বিভিন্ন চোরাপথে আইএসের জন্য ফাণ্ড বা কোটি কোটি টাকা জোগাড় করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্লিপার সেল ও জঙ্গি মডিউল পরিচালনা করার মূল মাথা ছিল সে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিএনএন (CNN)-কে জানিয়েছে, আল-মিনুকি সরাসরি আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে এবং বিদেশে মার্কিন দূতাবাসে বড়সড় আত্মঘাতী হামলা চালানোর ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করছিল, যা ভেস্তে দিল পেন্টাগন।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১০-এর দশকের সেই রমরমা সময়ের পর ইসলামিক স্টেট এখন অনেকটাই কোণঠাসা। তার ওপর এই নাইজেরীয় বংশোদ্ভূত আর্থিক ডন খতম হওয়ায় আইএসের বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক এবং আর্থিক মেরুদণ্ড একপ্রকার পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। ট্রাম্পের সাফ কথা, “সে আর আফ্রিকার নিরীহ মানুষকে সন্ত্রস্ত করতে পারবে না বা আমেরিকানদের টার্গেট করার ছক কষতে পারবে না।” তবে আন্তর্জাতিক স্তরে আল-মিনুকির মৃত্যু আইএসের আফ্রিকান নেটওয়ার্কে বড় ধাক্কা হলেও, এই সংগঠনটি যেহেতু ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করে, তাই তাদের মূল উপড়ে ফেলতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।
আইএস দমন নিয়ে এটাই ট্রাম্পের প্রথম বিধ্বংসী অপারেশন নয়। এর আগেও নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টানদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ তুলে উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ার জঙ্গি ক্যাম্পগুলোতে জোরালো বিমান হামলা চালিয়েছিল মার্কিন সেনা। এমনকি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই সিরিয়ায় আইএসের ৩০টিরও বেশি গোপন অস্ত্রাগার ও পরিকাঠামো ড্রোনের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)। আজ আল-মিনুকির পতন সেই ধারাবাহিক মার্কিন আগ্রাসন ও সাফল্যেরই এক বড় অংশ, যা বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার দাপটকে আরও একবার প্রমাণ করল।





