পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির অভূতপূর্ব জয়ের পর থেকেই একটি প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে— বিজেপির এই ২০৭টি আসন পাওয়ার পেছনে কি তবে ‘SIR’ (ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া)-এর কোনও বড় ভূমিকা রয়েছে? তৃণমূলের ২১৫ থেকে ৮০-তে নেমে আসা এবং বিজেপির ৭৭ থেকে ২০৭-এ উত্থান কি কেবলই ভোটার তালিকার কাটছাঁটের ফল?
পরিসংখ্যান এবং ভোটের অঙ্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, আসল সত্যিটা অনেক বেশি গভীর। কেবল SIR নয়, বরং বিজেপির শক্তিশালী জনসমর্থনই এই ঝড়ের মূল কারিগর।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। এর মধ্যে ৫৮ লক্ষ ছিলেন মৃত বা পরিযায়ী এবং ২৭ লক্ষ ভোটারকে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়। এছাড়া ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বিভাগে যাচাই করা হয়েছিল আরও প্রায় ৬০ লক্ষ নাম।
বিজেপির জয় ও SIR-এর ব্যবধান
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি যে ৮৭টি আসন তৃণমূলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে, তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিজেপির জয়ের ব্যবধান বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
চুঁচুড়া: এখানে ভোটার বাদ পড়েছিলেন ১১,৮২৮ জন, অথচ বিজেপি জিতেছে ৪৩,৪৩৫ ভোটের বিশাল ব্যবধানে।
বলাগড়: বাদ পড়া ভোটার ৭,৩৫২ হলেও বিজেপি জিতেছে ৪১,৯১৪ ভোটে।
রানিবাঁধ: মাত্র ৫২২ জন ভোটার বাদ পড়লেও বিজেপি সেখানে ৫২,২৬৯ ভোটের রেকর্ড ব্যবধানে জয়ী হয়েছে।
অর্থাৎ, এই কেন্দ্রগুলোতে ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও তৃণমূলের পক্ষে ফল ঘোরানো প্রায় অসম্ভব ছিল।
যেখানে SIR প্রভাব ফেলেছে
তবে সব কেন্দ্রে চিত্রটা এক নয়। কিছু আসনে SIR-এর প্রভাব সরাসরি অনুভূত হয়েছে। যেমন কুশমন্ডি কেন্দ্রে বিজেপি ২০২১-এ ১২,৫৮৪ ভোটে হেরেছিল, কিন্তু এবার ৯,০৬৩ ভোটে জিতেছে। এখানে ১৩,৫০০ ভোটার বাদ পড়েছিলেন। একইভাবে করণদিঘিতে ৩১,৫৬২ জন ভোটার বাদ পড়ায় বিজেপির জয় অনেকটা সহজ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তৃণমূলের গড় ও ব্যবধানের ধস
তৃণমূলের দুর্গ হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রগুলোতেও জয়ের ব্যবধান আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তরবঙ্গের অনেক আসনেই তৃণমূল জিতলেও তাদের জয়ের মার্জিন তলানিতে ঠেকেছে।
সিতাই: ২০ হাজার ভোটার বাদ পড়ায় তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ১০ হাজার থেকে কমে ৩ হাজারে নেমে এসেছে।
সামশেরগঞ্জ: এখানে ৭৫ হাজার ভোটার বাদ পড়া নিয়ে চরম বিতর্ক ছিল। ফলে তৃণমূলের ২৬ হাজারের লিড কমে ৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
বিজেপির অস্বস্তি কোথায়?
বিজেপির জয় সর্বত্র সমান দাপুটে ছিল না। খোদ দার্জিলিং-এ বিজেপির জয়ের ব্যবধান ২১ হাজার থেকে কমে ৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বহরমপুর এবং তুফানগঞ্জেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত: রাজ্য জুড়ে বিজেপির প্রবল ঝোড়ো হাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া (Anti-incumbency) দুই শিবিরের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করেছে। তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনা কিছু স্পর্শকাতর আসনে প্রভাব ফেললেও, সামগ্রিকভাবে বিজেপির এই উত্থান মূলত তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় ধসেরই প্রতিফলন।





