বাংলায় ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই বদলে গেল নবান্নের চেনা কাজের পরিবেশ। সোমবার রাজ্যের শীর্ষ আমলা ও সচিবদের নিয়ে প্রথমবার বৈঠকে বসে নিজের প্রশাসনিক অবস্থান স্পষ্ট করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রসচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ— প্রত্যেকের সামনেই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, নতুন সরকারে ‘মোসাহেবি’ বা ‘অনুপ্রেরণা’র কোনও জায়গা নেই।
‘আমার হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলাবেন না’ বৈঠকের শুরুতেই আমলাদের মানসিক জড়তা কাটাতে বড় বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সাফ জানান, “আমার প্রতিটি কথায় হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানোর কোনো প্রয়োজন নেই। যেখানে যেমন প্রয়োজন, আপনারা স্বাধীনভাবে আপনাদের মতামত জানাবেন।” শুভেন্দুর কথায়, এ বার সরকার চলবে বি আর অম্বেদকরের আদর্শে— ‘ফর দ্য পিপল’ বা জনগণের জন্য। অযথা সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধ করার ওপরও কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সরাসরি নজরদারি প্রশাসনের কাজে গতি আনতে এবং সমন্বয় বাড়াতে একটি বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই গ্রুপে মুখ্যসচিব থেকে শুরু করে প্রতিটি দপ্তরের সচিবরা থাকবেন এবং খোদ মুখ্যমন্ত্রীও সেখানে সরাসরি যুক্ত থাকবেন। ফলে এখন থেকে যে কোনও ফাইলের স্থিতি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আমলারা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন।
সচিবদের জন্য ‘গাজর ও লাঠি’ নীতি অফিসারদের প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে সরকার চালানোর আশ্বাস দিলেও ফাঁকিবাজি বরদাস্ত করা হবে না বলে স্পষ্ট করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “আপনারা নির্ভয়ে পরামর্শ দিন, আমি শুনব। যাঁরা সততার সঙ্গে কাজ করবেন, আমি তাঁদের পাশে আছি। কিন্তু কেউ ভুল করলে বা কাজে গাফিলতি দেখা দিলে তাঁর কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে এবং কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কেন্দ্রীয় প্রকল্প ও নিয়োগ নিয়ে ‘অ্যাকশন প্ল্যান’: রাজ্যে থমকে থাকা কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলো নিয়ে বড় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন:
কেন্দ্রীয় ফান্ড: বন্ধ থাকা কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলো দ্রুত শুরু করতে হবে। দিল্লি থেকে যাতে দ্রুত ফান্ড রিলিজ হয়, নতুন সরকার সেই ব্যবস্থা করবে।
নিয়োগে স্বচ্ছতা: সব দপ্তরে নিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যা মেটাতে দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে। শিক্ষা সচিবকে তাঁর কড়া নির্দেশ, “নিয়োগ হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে। কোনো তদ্বির নয়, ডিওপিটি (DoPT)-র রুল বুক মেনে আইন অনুযায়ী কাজ করতে হবে।”
সংকল্প পত্র: নির্বাচনের আগে বিজেপির ইশতেহারে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
ডিএ ও পে-কমিশন নিয়ে বার্তা সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ডিএ এবং সপ্তম পে-কমিশন নিয়েও এদিন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বকেয়া পাওনা এবং বেতন কাঠামোর বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। তবে সবকিছুই হবে নিয়ম ও স্বচ্ছতা মেনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম বৈঠকেই আমলাদের ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘দায়বদ্ধতা’— দুইয়ের পাঠ পড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী বুঝিয়ে দিলেন, নবান্নের অন্দরে ‘কথা কম, কাজ বেশি’র সংস্কৃতিই এবার ফিরতে চলেছে।





