নিজেই লড়ছেন নিজের মামলা? মমতা ব্যানার্জীর ‘আইনজীবী’ অবতার নিয়ে উত্তাল বার কাউন্সিল!

রাজনীতির ময়দান থেকে বিচার ব্যবস্থার অলিন্দ— সর্বত্রই এখন আলোচনার কেন্দ্রে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে তাঁর এক অভাবনীয় উপস্থিতি রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছে। কোনো জননেত্রী হিসেবে নয়, বরং নিখুঁত আইনজীবীর পোশাকে আদালতে হাজির হয়ে সওয়াল করতে দেখা গেল তাঁকে। এই ছবি ভাইরাল হতেই নড়েচড়ে বসেছে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (BCI)।

বার কাউন্সিলের কড়া প্রশ্ন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘আইনজীবী’ পরিচয় ঘিরেই দানা বেঁধেছে বিতর্ক। বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া রাজ্য সংস্থার কাছে একাধিক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি কি আইন পেশা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরতি নিয়েছিলেন? তাঁর তালিকাভুক্তি নম্বর (Enrollment Number) কত? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত একটি লাভজনক পদে আসীন থাকার পর, পুনরায় ওকালতি শুরু করার জন্য তিনি কি প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়েছিলেন?

আইন অনুযায়ী, কোনো আইনজীবী যদি উচ্চপদস্থ সরকারি বা সাংবিধানিক পদে যোগ দেন, তবে তাঁকে বার কাউন্সিলকে চিঠি লিখে পেশা থেকে বিরতি নিতে হয়। পদ ছাড়ার পর আবার প্র্যাকটিস শুরু করতে গেলেও লাগে বিশেষ অনুমতি। মমতার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি মানা হয়েছে কি না, তা নিয়েই এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

নিজের মামলা নিজে লড়া: আইন কী বলে?
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অশ্বিনী কুমার দুবের মতে, ভারতীয় সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে নিজের মামলা নিজে লড়ার অধিকার দেয়। তবে এর পেছনে রয়েছে সূক্ষ্ম কিছু আইনি প্যাঁচ:

আইনজীবী বনাম আবেদনকারী: আপনি নিজের মামলা নিজে লড়তে পারেন, তার জন্য আইনের ডিগ্রি না থাকলেও চলে। কিন্তু আপনি যদি ‘আইনজীবী’ হিসেবে সওয়াল করতে চান, তবে আপনার কাছে বৈধ বার কাউন্সিল রেজিস্ট্রেশন এবং ‘প্র্যাকটিসিং সার্টিফিকেট’ থাকা বাধ্যতামূলক।

আদালতের অনুমতি: এজলাসে দাঁড়িয়ে সওয়াল করতে হলে আদালতের পূর্বানুমতি লাগে। শুধু আবেগ দিয়ে নয়, বরং নির্দিষ্ট আইনি কার্যপ্রণালী মেনেই আবেদন করতে হয়।

অন্যের হয়ে সওয়াল: নিজের মামলা নিজে লড়া গেলেও, পেশাদার আইনজীবী না হয়ে আপনি কখনই অন্য কারোর হয়ে সওয়াল করতে পারেন না।

মমতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য আদালতের এজলাস নতুন কিছু নয়। ১৯৮৪ সালে বালুরঘাট আদালতে যুব কংগ্রেস কর্মীদের হয়ে হোক বা ২০২৬-এর নির্বাচন পরবর্তী মামলা— তিনি বারবার সক্রিয় থেকেছেন। কিন্তু এবারের বিতর্কটি মূলত তাঁর ‘পোশাক’ এবং ‘পরিচয়’ নিয়ে।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলক ১৯০৮ সালে ব্রিটিশ আদালতে দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টা ধরে নিজের রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলার সওয়াল করেছিলেন। পরবর্তীকালে অরবিন্দ কেজরিওয়াল বা সুব্রহ্মণ্যম স্বামীকেও আদালতে নিজেদের হয়ে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু রাম জেঠমালানির মতো যারা পেশাদার আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ উভয়ই ছিলেন, তাঁদের বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মামলাটি দেশের বিচার ব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে— গণতান্ত্রিক অধিকার বনাম পেশাদার আইনি বাধ্যবাধকতার সীমানা ঠিক কোথায়? আদালত কারোর কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয় না ঠিকই, কিন্তু আইনের পোশাক পরার জন্য যে যোগ্যতার প্রয়োজন, তা নিয়ে আপস করতে নারাজ বার কাউন্সিল।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy