জাতীয় সংগীতের অবমাননা না কি প্রোটোকল বিভ্রাট? ‘বন্দে মাতরম’ ইস্যু নিয়ে উত্তাল কেরলের রাজনীতি

কেরল বিধানসভার এক সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’-এর খণ্ডিত রূপ পরিবেশন ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শাসকদল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ, প্রধান বিরোধী দল সিপিআই(এম) এবং বিজেপি-র মধ্যে আদর্শগত সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেরলের রাজনৈতিক আকাশ এখন উত্তাল। রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আরলেকারের উপস্থিতিতে এই বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে, যা দ্রুত একটি বড়সড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত বিধানসভার একটি অনুষ্ঠানে। প্রোটোকল ভেঙে ‘বন্দে মাতরম’-এর মাত্র একটি অংশ বাজানো হয়। এই ঘটনায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আরলেকার। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যেকোনো সরকারি অনুষ্ঠানে যেখানে রাজ্যপালের উপস্থিতি থাকে, সেখানে জাতীয় সংগীতের পূর্ণ মর্যাদা বজায় রাখা এবং প্রোটোকল মেনে পুরো গানটি বাজানো বাধ্যতামূলক। তিনি জানিয়েছেন, বিধানসভার স্পিকারের কাছে ইতিমধ্যেই তিনি নিজের তীব্র আপত্তির কথা জানিয়েছেন।

তবে এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা এলডিএফ নেতা পিনারাই বিজয়ন। তিনি এই বিতর্ককে সরাসরি আরএসএস-এর এজেন্ডা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিজয়ন সাফ জানিয়েছেন, পুরো গান গাওয়ার কোনো আইনি প্রয়োজনীয়তা নেই। সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বিস্ফোরক মন্তব্য করে বলেন, “কেরল আরএসএস-এর কোনো এজেন্ডার কাছে মাথা নত করবে না।” এখানেই থেমে না থেকে তিনি আরও যোগ করেন, গানটি চলার সময় উঠে দাঁড়ানোরও কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাকিদের সম্মানের খাতিরেই তারা উঠে দাঁড়িয়েছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে, বিজেপি এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে কংগ্রেস ও ইউডিএফ সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছে। বিজেপি নেতা ভি মুরলীধরন বলেন, কেন্দ্রের স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও কেরল সরকার তা লঙ্ঘন করেছে। এটি কেবল রাজ্যপালের অপমান নয়, ১৫০ বছরে পদার্পণ করা ভারতের জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি চরম অবমাননা। মুরলীধরনের অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামী ও সিপিআই(এম)-কে তুষ্ট করতেই ইউডিএফ সরকার এই পথ বেছে নিয়েছে। কংগ্রেসকে খোঁচা দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ১৮৯৬ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনেই প্রথম ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হয়েছিল। আজ কেন কংগ্রেস সেই গান নিয়ে এত অস্বস্তিতে, তা মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীসানের কাছে জানতে চেয়েছেন তিনি।

জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বনাম রাজনৈতিক আদর্শের লড়াইয়ে কেরলের এই বিধানসভা প্রাঙ্গণ এখন কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক প্রোটোকল এবং জাতীয় স্তরের আবেগ—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই ইস্যু আগামী দিনে কেরলের রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy