বিধানসভা নির্বাচনের ফলে রাজ্যজুড়ে নানা সমীকরণ তৈরি হলেও, সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে জঙ্গলমহলে। ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া—এই তিন জেলায় কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। লোকসভা নির্বাচনে যে অঞ্চলে শাসক দল দুটি আসন ধরে রাখতে পেরেছিল, মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে সেখানে কেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তৃণমূলের সংগঠন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর নেপথ্যে একাধিক বিস্ফোরক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন।
তৃণমূলের অন্দরের খবর এবং রাজনৈতিক মহলের মতে, জঙ্গলমহলে দিদির (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রতি মানুষের যে গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধা ছিল, তা সুপরিকল্পিতভাবে নষ্ট করেছে ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)। অভিযোগ উঠেছে, আইপ্যাকের অযোগ্য কর্মীরা সংগঠনের পুরনো ও ত্যাগী কর্মীদের সরিয়ে দিয়ে এমন কিছু মুখকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন, যাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনও সংযোগ নেই। বহু পুরনো কর্মীর সঙ্গে অশালীন আচরণ এবং লুম্পেনদের দিয়ে সমাজ পরিচালনার চেষ্টা সাধারণ মানুষের মনে প্রবল ক্ষোভের জন্ম দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘পয়সা দাও আর চুরির লাইসেন্স নাও’—এই সংস্কৃতি প্রশাসন থেকে শুরু করে নিচু তলার নেতা-কর্মীদের একাংশের মজ্জায় ঢুকে গিয়েছিল। জঙ্গলমহলের সাধারণ মানুষকে ‘Taken For Granted’ ভেবে নেওয়াটাই কাল হয়েছে শাসক দলের জন্য।
অন্যদিকে, জঙ্গলমহলে এই ধসের পিছনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘শুভেন্দু অধিকারী মডেল’। ২০০৮ সাল থেকে শুভেন্দু অধিকারী এই জেলাগুলোতে নিজের অবাধ যাতায়াত বজায় রেখেছেন। একসময় তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে জঙ্গলমহলের দায়িত্ব সামলানো শুভেন্দু অধিকারী বর্তমানে বিরোধী দলনেতা হলেও, জঙ্গলমহলের মানুষের কাছে নিজের ‘ঘরের ছেলে’ ইমেজটি ধরে রাখতে সফল হয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জনসংযোগ এবং রণকৌশল জঙ্গলমহল জুড়ে তৃণমূলকে শূন্যে নামিয়ে আনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
এর পাশাপাশি আরএসএস-এর (RSS) নিরন্তর কাজকে খাটো করে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। ২০২৫ সালের আরএসএস-এর শতবর্ষকে সামনে রেখে গত এক বছর ধরে বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বিভিন্ন বনবাসী বিদ্যালয়গুলো জঙ্গলমহলের একেবারে প্রান্তিক স্তরে গিয়ে কাজ করেছে। নিঃশব্দে চালানো এই ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর খবর বুঝতেই পারেনি তৃণমূল নেতৃত্ব। আদিবাসী আবেগকে হাতিয়ার করে তৃণমূল যখন ‘পাশে আছি’ বার্তা দিয়েছে, ততক্ষণে ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে হিন্দুত্বের ও উন্নয়নের মেলবন্ধন ঘটিয়ে দিয়েছে সংঘ পরিবার। ফলস্বরূপ, ভোটবাক্সে শাসক দলের আদিবাসী তকমা মুখ থুবড়ে পড়েছে।





