আজ কলকাতা থেকে লন্ডন যাওয়ার কথা ভাবলেই আমাদের মাথায় আসে ঝকঝকে বিমান আর মাত্র ১০-১২ ঘণ্টার উড়ান। কিন্তু আজ থেকে কয়েক দশক আগে, প্রযুক্তির এত রমরমা যখন ছিল না, তখন কলকাতার ধর্মতলা থেকে বাসে চড়ে সরাসরি পৌঁছে যাওয়া যেত সুদূর লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনে! ভাবছেন গল্প কথা? একদমই নয়। বিমান বা বিলাসবহুল জাহাজ নয়, স্রেফ বাসের চাকায় ভর করে মাঝের ১১টি দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারত থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার এক গৌরবময় এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাস রয়েছে এই কলকাতার বুকে।
বিশ্বের দীর্ঘতম বাস রুট: শুরুটা যেভাবে
১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল। ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায় জুড়ে দিয়ে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করেছিল ‘অ্যালবার্ট’ (Albert Travel) নামের একটি বাস। প্রায় ৫০ দিনের যাত্রা শেষে সেটি এসে পৌঁছায় কলকাতার ধর্মতলায়। সেই যুগে এটিই ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম বাস রুট (World’s Longest Bus Route)। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত, প্রায় দুই দশক ধরে কলকাতা ও লন্ডনের মধ্যে এই অবিশ্বাস্য বাস পরিষেবা চালু ছিল।
এক বাসে ১১টি দেশ! কেমন ছিল সেই রুট?
কলকাতা থেকে ছেড়ে এই বাসটি কোন কোন দেশের ওপর দিয়ে লন্ডনে পৌঁছাত, তা শুনলে আজকের যুগের ভ্রমণপিপাসুদের গায়ে কাঁটা দেবে। বাসটি মূলত ওল্ড গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে ভারত ছাড়ত।
যাত্রাপথের প্রধান দেশগুলি ছিল:
ভারত $\rightarrow$ পাকিস্তান $\rightarrow$ আফগানিস্তান $\rightarrow$ ইরান $\rightarrow$ তুরস্ক $\rightarrow$ বুলগেরিয়া $\rightarrow$ যুগোস্লাভিয়া $\rightarrow$ অস্ট্রিয়া $\rightarrow$ পশ্চিম জার্মানি $\rightarrow$ ফ্রান্স $\rightarrow$ ইংল্যান্ড।
লন্ডন পৌঁছানোর আগে বাসটিকে ইংলিশ চ্যানেল পার করার জন্য বিশেষ ফেরি বা জাহাজের সাহায্য নিতে হতো।
ইতিহাসবিদদের মতে, “এটি কেবল একটি সাধারণ বাস যাত্রা ছিল না, এটি ছিল চলন্ত এক রাজপ্রাসাদ। বাসের ভেতরেই ছিল বিলাসবহুল শয্যা, রান্নার আধুনিক সরঞ্জাম, রেডিও এবং ক্যাসেট প্লেয়ার, এমনকি বাইরে দৃশ্য দেখার জন্য বিশেষ অবজারভেশন ডেক!”
কত ছিল ভাড়া আর কী মিলত সুযোগ-সুবিধা?
১৯৫৭ সালে যখন এই বাস পরিষেবা শুরু হয়, তখন কলকাতা থেকে লন্ডন যাওয়ার এক পিঠের ভাড়া ছিল মাত্র ৬৫ পাউন্ড (যা তৎকালীন ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮৫ টাকা থেকে শুরু করে পরবর্তীতে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছিল)।
এই ভাড়ার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকত:
বাসে বিলাসবহুল ভ্রমণের সুবিধা ও রাতে থাকার হোটেল।
যাত্রাপথের সমস্ত দর্শনীয় স্থান (যেমন তেহরানের রাজপ্রাসাদ, ইস্তাম্বুলের তাজমহল খ্যাত মসজিদ, স্যালজবার্গের সৌন্দর্য) ঘুরে দেখার গাইড ট্যুর।
সকালের জলখাবার, দুপুরের লাঞ্চ ও রাজকীয় রাতের খাবার।
কেন বন্ধ হয়ে গেল এই রূপকথার সফর?
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে ইরান ও আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আবহের কারণে এই রুটে বাস চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৭৬ সালে পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যায় এই ঐতিহাসিক কলকাতা-লন্ডন বাস সার্ভিস।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট, ভিসা আর কড়া আন্তর্জাতিক নিয়মের বেড়াজালে এমন একটি সড়ক যাত্রা কল্পনা করাও অসম্ভব। তবে কলকাতার ইতিহাসের পাতায় এই ‘লন্ডন বাস’ আজও এক রোমাঞ্চকর রূপকথা হয়ে রয়ে গিয়েছে।





