ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনেও বাংলার রাজনীতিতে বামেদের রক্তক্ষরণ অব্যাহত। বিশেষ করে তথাকথিত শিক্ষিত ও শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে ফের বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে বামফ্রন্ট। এমনকি এক সময়ের বাম দুর্গ হিসেবে পরিচিত যাদবপুর কেন্দ্রেও বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের মতো প্রার্থীর হার এবং ভোট শতাংশ মাত্র ৯.৬৯ শতাংশে নেমে আসা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’?
নির্বাচনী ফলাফলের প্রাথমিক পর্যালোচনায় বাম নেতৃত্বের একাংশ বেশ ক্ষুব্ধ। দলের রাজ্য কমিটির এক নেতার গলায় শোনা গিয়েছে চরম হতাশার সুর। তাঁর দাবি, “সরকারি চাকরিজীবী থেকে শুরু করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অনেকেই আমাদের মিছিলে হেঁটেছেন, মিটিংয়ে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় তাঁরা বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন। এই শিক্ষিত শ্রেণিকে বিশ্বাস করাটাই ভুল হয়েছে।” দলের অন্দরে অনেকই মনে করছেন, এই শ্রেণিটি কার্যত ‘বিশ্বাসঘাতকের’ মতো ভূমিকা পালন করেছে।
যাদবপুর থেকে বালিগঞ্জ: ধসের খতিয়ান
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সালের পর থেকেই কলকাতা ও শহরতলি এলাকায় বামেদের জনভিত্তি আলগা হতে শুরু করেছে।
যাদবপুর: ২০০৬ সালে যেখানে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ৬১.৩০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, সেখানে ছাব্বিশের নির্বাচনে তা ১০ শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছে।
এন্টালি: ২০১১ সালে ৩৭.৭১ শতাংশ ভোট পেলেও এবার তা তলানিতে ঠেকেছে।
একই চিত্র কসবা, টালিগঞ্জ, ভবানীপুর ও রাসবিহারীর মতো কেন্দ্রগুলোতেও। একের পর এক কেন্দ্রে বাম প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া এখন অভ্যেসে পরিণত হয়েছে।
সংগঠনের কঙ্কালসার চেহারা
সিপিএম কলকাতা জেলা কমিটির সম্পাদক কল্লোল মজুমদারের মতে, ফলাফলের হিসেব স্পষ্ট বলছে যে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সমর্থন মেলেনি। তবে তিনি সংগঠনের দুর্বলতার কথাও স্বীকার করে নিয়েছেন। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত কর্মী বা মজবুত সংগঠন না থাকাটাও এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তিনি।
সিপিআই নেতা প্রবীর দেবও এই ব্যর্থতা মেনে নিয়ে জানিয়েছেন, গত ১৫ বছর ধরে একাধিক জনমুখী ইস্যু থাকা সত্ত্বেও বামেরা মানুষের মনের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। কেন শিক্ষিত সমাজ মুখ ফিরিয়ে নিল, তা নিয়ে এখন গভীর আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন।
পরবর্তী লক্ষ্য: ‘রুটস’-এ ফেরা
শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ওপর থেকে ভরসা কমিয়ে এবার বামেরা তাদের পুরনো রণকৌশল অর্থাৎ ‘গরিব ও প্রান্তিক মানুষের’ কাছে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছে। বাম নেতাদের মতে, বিজেপি ও তৃণমূলের রাজনীতির মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষ যখন আক্রান্ত হবেন, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েই ফের নিজেদের হারানো জমি উদ্ধারের চেষ্টা করবে বামফ্রন্ট।





