একসময় ভারতের স্টার্টআপ জগতের পোস্টার বয় ছিলেন বাইজু রবীন্দ্রন। ২২ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি, বিশ্বজুড়ে লগ্নিকারীদের লম্বা লাইন এবং ভারতীয় ক্রিকেট দলের জার্সিতে সংস্থার নাম— সব মিলিয়ে বাইজু’স (Byju’s) ছিল সাফল্যের প্রতিশব্দ। কিন্তু সেই উজ্জ্বল আকাশেই এখন ঘোর অন্ধকার। আদালত অবমাননা ও সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখার অভিযোগে এবার বাইজু রবীন্দ্রনকে ৬ মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে সিঙ্গাপুরের একটি আদালত। একসময়ের ‘ইউনির্ন’ সাফল্যের এই পতন ভারতের কর্পোরেট ইতিহাসের অন্যতম বড় সতর্কবার্তা।
২০১১ সালে ‘থিঙ্ক অ্যান্ড লার্ন প্রাইভেট লিমিটেড’ দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সংস্থা অতিমারির সময় অনলাইন শিক্ষার জোয়ারে নিজেকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল। বাইজু রবীন্দ্রন আগ্রাসী নীতি নিয়ে একের পর এক সংস্থা অধিগ্রহণ শুরু করেন। আকাশ এডুকেশনাল সার্ভিসেস থেকে গ্রেট লার্নিং—৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে সাম্রাজ্য বিস্তারে কোনো কার্পণ্য করেননি তিনি। কিন্তু বিপত্তি শুরু হয় ২০২১ সালে ১.২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিদেশি ঋণ নেওয়ার পর থেকে।
আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব, সময়মতো অডিট রিপোর্ট জমা না দেওয়া এবং একের পর এক অডিটরের পদত্যাগে লগ্নিকারীদের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধে। সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণটি ঘটে যখন অভিযোগ ওঠে যে প্রায় ৫৩৩ মিলিয়ন ডলার গোপনে অন্য জায়গায় সরানো হয়েছে। সিঙ্গাপুর ও আমেরিকার আদালতে মামলা শুরু হয়। ঋণদাতাদের দাবি, বাইজু রবীন্দ্রন আইনি প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি করে সম্পত্তির বিবরণ গোপন রেখেছেন। ‘বিয়ার ইনভেস্টকো প্রাইভেট’ নামক সংস্থার মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য লুকিয়ে রাখাটাই আজকের আইনি সংকটের মূল কারণ।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন ভারতে ন্যাশনাল কোম্পানি ল আইন ট্রাইব্যুনাল (NCLT) সংস্থার বিরুদ্ধে দেউলিয়া প্রক্রিয়া শুরু করে। বিসিসিআই-এর ১৫৮ কোটি টাকার বকেয়া পাওনা না মেটাতে পেরে বাইজু’স এখন চরম সংকটের মুখে। আকাশ এডুকেশনাল সার্ভিসেসের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো থেকে শুরু করে হাজার হাজার কর্মীর ছাঁটাই, বোর্ড মেম্বারদের পদত্যাগ—সব মিলিয়ে একসময় ২২ বিলিয়ন ডলারের এই সংস্থাটির বাজারমূল্য বর্তমানে নেমে এসেছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে। এমনকি ফোর্বস ম্যাগাজিন বাইজু রবীন্দ্রনের সম্পদের পরিমাণ ‘শূন্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
নিজের স্বপক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও, রবীন্দ্রন এখন আইনি জটিলতার বেড়াজালে বন্দি। ভারতের স্টার্টআপ মহলে বাইজু’স এখন এক জ্বলন্ত উদাহরণ যে, দ্রুত বৃদ্ধির নেশায় অতিরিক্ত ঋণ এবং দুর্বল আর্থিক শাসন কীভাবে একটি সাম্রাজ্যকে নিমেষের মধ্যে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এই পতন কেবল একটি কোম্পানির নয়, বরং সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পতন যা নৈতিকতা ও স্বচ্ছতাকে বিসর্জন দিয়েছিল।





