অমিতাভ-শাহরুখের সহ-অভিনেতার জীবনে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি! স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে সেই ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেল!

বাইরে থেকে সিনে জগতের তারকাদের জীবন যতই ঝাঁ চকচকে, সুন্দর এবং বিলাসবহুল দেখতে লাগুক না কেন, আদতে সবসময় সেই চিত্রটা সত্য হয় না। পর্দার গ্ল্যামার আর আলোর রোশনাইয়ের আড়ালে অনেক সময়েই লুকিয়ে থাকে এমন কিছু মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি, যা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল সত্তর ও আশির দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় এক অভিনেতার ব্যক্তিগত জীবনে। তাঁর স্ত্রী এক ভয়াবহ এবং নৃশংস ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। স্ত্রীকে গণধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের মুখে পড়তে হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সেই লজ্জিত করার মতো ছবি দেখিয়ে লাগাতার ব্ল্যাকমেল করা হতো পরিবারটিকে। একসময়ে এই মহিলার সঙ্গে বিখ্যাত পরিচালক মহেশ ভাটের নামও জড়িয়ে নানা গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া সিলভার স্ক্রিনের সেই জনপ্রিয় অভিনেতা ও তাঁর পরিবারের পেছনের এই কালো ইতিহাস আজও টিনসেল টাউনের অন্ধকারতম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
আলোচ্য এই জনপ্রিয় অভিনেতার আসল নাম ছিল ভগবানদাস মুলচন্দ লুথরিয়া। ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণ করার পর যখন তিনি সিলভার স্ক্রিনের আলোয় পা রাখেন, তখন নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘সুধীর’। আর পরবর্তী সময়ে ঠিক এই নামেই তিনি সারা দেশে অভাবনীয় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০-র দশকের বলিউড ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম অতি পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি। অমিতাভ বচ্চনের মতো মেগাস্টারের সঙ্গে ‘দিওয়ার’, ‘দোস্তানা’, ‘শারাবি’ এবং ‘মেরি জং’, ‘খোটে সিক্কে’, ‘বাদশা’, ‘হরে রামা হরে কৃষ্ণ’-র মতো একাধিক আইকনিক সুপারহিট ছবিতে অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা শাহরুখ খানের সঙ্গেও স্ক্রিন শেয়ার করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু পেশাগত জীবনের এই বর্ণাঢ্য সাফল্যের বিপরীতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনটা ছিল এক রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডিতে ভরা, যা কোনো রূপোলি পর্দার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম মর্মান্তিক ছিল না।
সুধীরের ব্যক্তিগত জীবনের সবথেকে বড় এবং কালো অধ্যায়টি আবর্তিত হয়েছিল তাঁর স্ত্রীকে কেন্দ্র করে। সেই সময়ে অভিনেতা ও তাঁর সমগ্র পরিবারের ওপর দিয়ে এক মারাত্মক মানসিক ও সামাজিক ঝড় বয়ে গিয়েছিল। সুধীরের স্ত্রী শীলা রায় পেশাগতভাবে একজন উঠতি অভিনেত্রী এবং ফ্যাশন মডেল ছিলেন। সেই যুগে গ্ল্যামার দুনিয়ায় কাজ করার সুবাদে তাঁর নাম একাধিকবার পরিচালক মহেশ ভাটের সঙ্গে জড়িয়ে নানা মুখরোচক চর্চা তৈরি করেছিল। সেসময় ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে কান পাতলে শোনা যেত যে তাঁদের মধ্যে নাকি বিশেষ প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। তবে চলচ্চিত্র সমালোচক ও বোদ্ধাদের একাংশের মতে, সেই সমস্ত গুঞ্জন কেবলই রটনা এবং অনুমান মাত্র ছিল। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে ১৯৭৭ সালে শীলার সঙ্গে এমন এক ভয়াবহ ও অমানবিক ঘটনা ঘটে, যা তাঁদের গোটা সুন্দর জীবনটাকে চিরতরে ওলোটপালোট করে দিয়ে অন্ধকারের অতলে ঠেলে দিয়েছিল।
পরবর্তীকালে অতীতে একবার সুধীর এবং শীলার পুত্র অশোক ব্যাঙ্কার তাঁর মায়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও অন্ধকার ইতিহাস নিয়ে একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছিলেন। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে অশোক অত্যন্ত বেদনাদায়ক এক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন যে, তাঁর মাকে মুম্বইয়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও অভিজাত আবাসিক বিল্ডিং ‘উষা কিরণ’-এর অন্দরে শারীরিক ভাবে চরম নিগ্রহ করা হয়েছিল। মুম্বইয়ের অন্যতম পশ এবং সুরক্ষিত এলাকায় অবস্থিত সেই অভিজাত ভবনে তাঁকে বর্বরোচিতভাবে ধর্ষণ করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তৎকালীন মুম্বইয়ের একাধিক শীর্ষস্থানীয় বলিউড তারকা এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা ওই ভবনেই বসবাস করতেন এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একাধিক ব্যক্তি এই পৈশাচিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল। নিগ্রহের শিকার হওয়ার পর তাঁর মাকে ওই বহুতল ভবনের বাইরে সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভবনের নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে তুলে ভেতরে নিয়ে আসেন। সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে অশোক আরও জানিয়েছিলেন যে, তিনি যখন নিজের মাকে ওই নিথর ও অচৈতন্য অবস্থায় প্রথম দেখতে পেয়েছিলেন, তখন তাঁর গলার ভেতর থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল। তিনি দৌড়ে গিয়ে মায়ের নিস্তেজ শরীর জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেছিলেন।
ওই নৃশংস ঘটনা প্রসঙ্গে অশোক আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করে জানিয়েছিলেন যে, ওই ভবনেরই একটি নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে আটকে রেখে তাঁর মাকে একের পর এক ড্রাগসের অতিরিক্ত ডোজ বা নেশার ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। সেই কুকর্মে মোট চারজন ব্যক্তি সরাসরি যুক্ত ছিল, যার মধ্যে একজন আবার পেশাদার ফটোগ্রাফারও ছিলেন। সেই নরপশুরা অত্যন্ত সুকৌশলে দলবদ্ধ ধর্ষণ বা গ্যাং রেপের সেই লজ্জাজনক ঘটনার ছবি ক্যামেরাবন্দী করে রেখেছিল এবং পরবর্তীকালে সেই ছবিগুলো দিয়েই ব্ল্যাকমেল করা শুরু হয়। কিন্তু সমাজের নিষ্ঠুর চোখ, মানসম্মান হারানোর ভয় এবং অপরাধীদের প্রভাবশালী পরিচয়ের চাপে পড়ে তাঁরা সেদিন পুলিশের কাছে কোনো রকম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার সাহস পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। ভয়ের বশে তাঁরা সম্পূর্ণ চুপচাপ মুখ বুজে সহ্য করেছিলেন। কিন্তু সেই ক্ষতচিহ্ন তাঁদের পুরো পরিবারের মানসিক স্থায়িত্বকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে মায়ের জীবনের সেই মর্মান্তিক সত্য ও সংগ্রামকেই অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ‘বিউটিফুল অ্যান্ড আগলি’ নামক বই ও কাজের মাধ্যমে সকলের সামনে তুলে ধরেন পুত্র অশোক।
এদিকে জীবনের শেষ দিনগুলোতে এসে চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল শীলাকে। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে অত্যন্ত অল্প বয়সে পরলোকগমন করেন শীলা রায়। ১৯৯০ সালে নিজের স্ত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর সুধীরও ধীরে ধীরে লাইমলাইট এবং গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে চিরতরে দূরে সরে যান। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক অসুস্থতা, একাকীত্ব এবং ব্যক্তিগত মানসিক অবসাদের কারণে তিনি সমাজের বাকি সমস্ত চেনাজানা পরিচিতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এক নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে শুরু করেন। গ্ল্যামারের আলোয় মোড়ানো বলিউডের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এমন এক করুণ ও বাস্তব জীবনের কাহিনী আজো যেকোনো সংবেদনশীল মানুষকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়।