বায়োমেট্রিক মেশিনের দিন শেষ! মোবাইল ফোনের এক ক্লিকেই এবার সরকারি কর্মচারীদের হাজিরা, নবান্নের মেগা আপডেট

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সরকারি দপ্তরে কর্মরত লক্ষ লক্ষ কর্মচারীদের হাজিরা দেওয়ার প্রচলিত নিয়মে এক বিরাট ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে চলেছে রাজ্য সরকার। এতদিন ধরে দপ্তরে উপস্থিত থাকার জন্য আলাদাভাবে ব্যয়বহুল বায়োমেট্রিক হার্ডওয়্যার মেশিন বসানোর যে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি চালু ছিল, তা এবার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হতে চলেছে। নতুন এবং আধুনিক এই নিয়মের ফলে রাজ্য সরকারের অধীনস্থ বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মচারীদের আর আলাদা কোনো মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা পাঞ্চ করার প্রয়োজন পড়বে না। পরিবর্তে, কর্মীরা এখন থেকে সরাসরি অফিস চত্বরের নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে থেকে নিজেদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই খুব সহজে হাজিরা বা অ্যাটেন্ডেন্স নথিভুক্ত করতে পারবেন। রাজ্য অর্থ দপ্তরের পক্ষ থেকে সম্প্রতি এই মর্মে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা ও বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, যেখানে সাফ জানানো হয়েছে যে সরকারের বিপুল আর্থিক অপচয় রোধ করতে এবং পুরো হাজিরা প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ ঝঞ্ঝাটহীন ও স্বচ্ছ করতেই এই আধুনিক মোবাইল-ভিত্তিক ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করতে হবে। এর পাশাপাশি সমস্ত দপ্তরের নিজস্ব সফটওয়্যার সলিউশনগুলিও অবিলম্বে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গিয়েছে যে, বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বায়োমেট্রিক মেশিন বসানোর বহুমুখী কাজ শুরু হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপক অভাব কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সঠিকভাবে কাজ করত না। অনেক সময় দেখা যেত মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে কিংবা সার্ভার ডাউন থাকার কারণে কর্মচারীদের হাজিরা দিতে গিয়ে দীর্ঘ লাইন ও অতিরিক্ত সময় নষ্ট হচ্ছে। এই সমস্ত সমস্যা চিরতরে দূর করতেই নতুন জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তিভিত্তিক মোবাইল অ্যাটেন্ডেন্স ব্যবস্থা নিয়ে আসা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে দপ্তরের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে অবস্থান করলেই কেবল মোবাইলের অ্যাপের মাধ্যমে উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের অফিস সময়মতো পৌঁছানো যেমন আরও সুনিশ্চিত হবে, তেমনই গোটা হাজিরা ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ থাকবে বলে জোরালো আশা প্রকাশ করেছে রাজ্য অর্থ দপ্তর। ইতিমধ্যে এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা দ্রুত সমস্ত দপ্তরে প্রেরণের প্রশাসনিক কাজও জোরকদমে শুরু হয়ে গিয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৫ জুন থেকে রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক হেডকোয়ার্টার নবান্নে কর্মীদের উপস্থিতির ওপর নজর রাখতে অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ করা হয়েছিল। নবান্নে বাধ্যতামূলকভাবে ‘ফেস রিকগনিশন’ বা মুখ সনাক্তকরণ বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল এবং আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে রাজ্যের সমস্ত সরকারি দপ্তরে এই ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর করার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নতুন এই নিয়মে দপ্তর প্রধানদের নির্দিষ্ট কিছু ছাড় দেওয়া হলেও বাকি সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অফিস চত্বরে প্রবেশ এবং প্রস্থান করার সময় মুখ সনাক্তকরণ যন্ত্রে হাজিরা নথিভুক্ত করার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। তবে সময়ের কড়াকড়ির ক্ষেত্রে জানানো হয়েছিল যে, নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরিবর্তন করে সকাল ১০টা বেজে ১৫ মিনিট থেকে ১১টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত হলে তাকে ‘লেট’ বা দেরিতে আগমন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। অন্যদিকে, সকাল ১১টার পর কোনো কর্মী অফিসে পৌঁছলে তাঁকে সরাসরি ‘অনুপস্থিত’ বা অ্যাবসেন্ট হিসেবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি, নির্ধারিত ছুটির সময়ের আগে অর্থাৎ বিকেল ৫টা বেজে ১৫ মিনিটের পূর্বে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মী অফিস ত্যাগ করলে তা ‘আর্লি ডিপার্চার’ বা দ্রুত প্রস্থান হিসেবে ধরা হবে। প্রশাসনিক মহলের মতে, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে হাজিরা দেওয়ার নতুন এই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সময়ের এই কড়া অনুশাসন যুক্ত হওয়ায় রাজ্যের সরকারি দপ্তরগুলিতে কর্মসংস্কৃতি আরও অনেক বেশি গতিশীল ও শৃঙ্খলিত হবে।