১৭ জুনের সেই রহস্যমৃত্যুতে বিরাট মোড়! এসটিএফ জওয়ান গ্রেপ্তার হতেই নড়েচড়ে বসল বিহার পুলিশ

বিহারের আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশি ব্যবস্থার অভ্যন্তরে এক চরম চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। রাজ্যের ভোজপুর জেলার পুলিশ সুপার রাজ শুক্রবার সকালে এক বিশেষ প্রেস কনফারেন্সে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে, একটি চাঞ্চল্যকর ভুয়ো এনকাউন্টারের (Fake Encounter) ঘটনায় সরাসরি যুক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগে বিহার পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)-এর এক জওয়ানকে গ্রেফতার করে কঠোর হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ধৃত ওই এসটিএফ জওয়ানের নাম অক্ষয় কুমার। এই লোমহর্ষক ঘটনায় ইতিমধ্যেই আরও চারজন পুলিশ কর্মীর বিরুদ্ধে চলা তদন্ত একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্রের জোরালো খবর অনুযায়ী, বাকি অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের গ্রেপ্তার করাও এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। পুলিশ সুপার আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, গত ১৭ জুনের ওই ভুয়ো সংঘর্ষের ঘটনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার পর ধৃত পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে একাধিক অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগের অকাট্য প্রমাণ হাতে এসেছে। পাশাপাশি বাকি চারজনের বিরুদ্ধেও ঠিক একই অভিযোগে অত্যন্ত কঠোর আইনি তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে চলতি বছরের গত ১৭ জুন তারিখে। ভোজপুর জেলার শাহপুর থানা এলাকার অন্তর্গত শান্ত ও গ্রামীণ বিলাউটি গ্রামে ওই সাজানো সংঘর্ষের ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। ঘটনার দিন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, যা দেখার পর রাজ্যজুড়ে সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিকরা সোচ্চার হয়ে অভিযোগ তোলেন যে, পুলিশের তরফ থেকে দেখানো ওই এনকাউন্টারটি আদতে সম্পূর্ণ ভুয়ো ও বানোয়াট। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া সেই বিতর্কিত ভিডিওটিতে স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল যে, এক ব্যক্তি পুলিশের সরাসরি কথামতো তাঁর হাতে থাকা পিস্তল বা অস্ত্রটি নিঃশব্দে মাটিতে ফেলে দিচ্ছেন। অথচ এর ঠিক পরেই পুলিশ অত্যন্ত সুকৌশলে তাকে নিষ্ক্রিয় করে গ্রেপ্তারের নাটক চালায়। কিন্তু ঘটনার ঠিক কিছু সময় পর ভোজপুর পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে দাবি করেছিল যে, পুলিশের সঙ্গে এক ভয়ঙ্কর ও রক্তক্ষয়ী এনকাউন্টারে এক কুখ্যাত দুষ্কৃতী নিহত হয়েছে।
পুলিশের সেই গুলিতে নিহত দুর্ভাগ্যজনক ওই ব্যক্তির আসল নাম ছিল ভরত ভূষণ তিওয়ারি। পরবর্তীতে ভরত ভূষণের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত রিপোর্টে দেখা যায় যে, তাঁর মৃতদেহে মোট চারটি মারাত্মক বুলেট বিদ্ধ হয়েছিল, যা পুলিশের আগের বয়ানকে তীব্রভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এই পৈশাচিক ঘটনার পরেই নিহত ব্যক্তির পরিবার সরাসরি আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটে। ভরতের ভাই চন্দন তিওয়ারি স্থানীয় কোতোয়ালি থানায় যে এফআইআর বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন, তাতে জগদীশপুরের তৎকালীন ডিএসপি রাজেশ শর্মা, শাহপুর থানার তখনকার ওসি রাজেশ মালাকার এবং এসটিএফের অভিযুক্ত জওয়ান অক্ষয় কুমারের নাম অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। নিহতের ভাই চন্দন তিওয়ারি সংবাদমাধ্যম ও তদন্তকারীদের কাছে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওটি দেখেই তারা সরাসরি অভিযুক্ত ওই পুলিশকর্মীদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে তিনি এও জানান যে, অপরাধের ওই নির্দিষ্ট সময়ে ঘটনাস্থলে আরও বহু পুলিশ কর্মী উপস্থিত ছিলেন, যাঁদের ভূমিকাও সমানভাবে সন্দেহজনক।
চাঞ্চল্যকর এই ভুয়ো সংঘর্ষের ঘটনাটি সামনে আসার পর বিহারের রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র ভূকম্পন সৃষ্টি হয়। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলগুলির পাশাপাশি খোদ ক্ষমতাসীন এনডিএ জোটের শরিক দলগুলির নেতারাও এই নৃশংস ঘটনার তীব্র প্রতিবাদে সরব হন। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ ও জনরোষের মুখে পড়ে বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী তাৎক্ষণিকভাবে এই ঘটনার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি একটি উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনেরও ঘোষণা করেন। পাটনা হাইকোর্টের বিশিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিনোদ কুমার সিনার সুযোগ্য সভাপতিত্বে গঠিত সেই বিচার বিভাগীয় কমিশন সরাসরি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং নিহত ভরত ভূষণের বাড়িতে গিয়ে তাঁর শোকস্তব্ধ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমস্ত বয়ান সুচারুভাবে নথিভুক্ত করে আসেন।
অন্যদিকে, এই বিচার ও ন্যায় পাওয়ার লড়াইয়ে ময়দানে নামেন স্থানীয় বিজেপি সাংসদ মনোজ তিওয়ারিও। তাঁরই বিশেষ উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় নিহত যুবকের হতভাগ্য বাবা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করে বিচার চান। সেই সাক্ষাতের পরই মুখ্যমন্ত্রী পরিবারটিকে দ্রুত এবং কঠোরতম বিচার পাওয়ার সম্পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছিলেন। অবশেষে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ঘটিয়ে বিভাগীয় তদন্তের স্পিড আপ করে এসটিএফ জওয়ান অক্ষয় কুমারকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ভোজপুর পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, আইনের হাত থেকে কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং খুব শীঘ্রই বাকি অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদেরও আইনের মুখোমুখি করা হবে।