ক্লান্তি থেকে স্মৃতিশক্তি লোপ! অবহেলা করলেই বিপদ, জেনে নিন ভিটামিন বি১২ ঘাটতির ৬টি মারাত্মক লক্ষণ

আমাদের শরীরকে সুস্থ ও সক্রিয় রাখতে ভিটামিন বি১২ (Vitamin B12) অত্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এটি আমাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করার পাশাপাশি স্নায়ুকে সুস্থ রাখে এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ পরিচালনা করতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, বহু মানুষের শরীরেই অজান্তেই এই ভিটামিনের অভাব দেখা দেয়। প্রথমের দিকে এর লক্ষণগুলি খুব একটা স্পষ্ট না হলেও, ধীরে ধীরে শরীর নানাভাবে সতর্ক সংকেত পাঠাতে শুরু করে। তাই এই উপসর্গগুলিকে কখনই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির প্রধান ৬টি লক্ষণ:
১. সবসময় চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা: পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম ও বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি সারাক্ষণ শরীর ক্লান্ত লাগে, কোনো কাজে মন না বসে কিংবা শক্তি না পান, তবে এটি ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির বড় লক্ষণ হতে পারে। এই ভিটামিনের অভাবে শরীরে পর্যাপ্ত সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয় না, যার ফলে শরীরের বিভিন্ন কোষে ঠিকমতো অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।

২. হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশ ভাব: হাত কিংবা পায়ে বারবার ঝিনঝিনি ধরা, অবশ লাগা বা সূচ ফোটার মতো অনুভূতি হওয়া আসলে স্নায়ুর সমস্যার স্পষ্ট ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন ধরে ভিটামিন বি১২-এর অভাব থাকলে তা স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি করার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

৩. মাথা ঘোরা ও শ্বাসকষ্ট: সামান্য হাঁটাহাঁটি করলেই মাথা ঘোরা, সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে কষ্ট হওয়া বা অল্প কাজেই জাঁকিয়ে শ্বাসকষ্ট হওয়া রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ার লক্ষণ হতে পারে, যা মূলত ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির কারণেও হয়ে থাকে।

৪. স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়া: অনেকেই মনে করেন বয়স বাড়ার কারণেই বুঝি সব ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু আদতে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির কারণেও মনোযোগ বা ফোকাস কমে যেতে পারে, বারবার ছোটোখাটো জিনিস ভুলে যাওয়া বা বিভ্রান্ত লাগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৫. জিভ লাল হয়ে যাওয়া বা মুখে ঘা: জিভে অতিরিক্ত জ্বালাভাব করা, অতিরিক্ত লাল হয়ে যাওয়া, ফুলে যাওয়া কিংবা মুখে বারবার ঘা হওয়াও ভিটামিন বি১২-এর অভাবের অন্যতম লক্ষণ। অনেক সময় খাবার খাওয়ার সময়েও তীব্র অস্বস্তি হয়।

৬. ত্বক ফ্যাকাশে বা হলদেটে দেখানো: রক্তে লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে মুখ ও ত্বকের প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে ত্বক ফ্যাকাশে বা সামান্য হলদেটে দেখাতে শুরু করে।

কোন খাবারে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন বি১২ পাওয়া যায়?
ভিটামিন বি১২ মূলত প্রাণিজ উৎস থেকেই বেশি পাওয়া যায়। তাই খাদ্যতালিকায় নিয়মিত রাখতে পারেন—মাছ (বিশেষ করে স্যামন, সার্ডিন ও টুনা), ডিম, দুধ, দই, পনির, মুরগির মাংস, রেড মিট এবং চিংড়ির মতো সামুদ্রিক মাছ। যাঁরা সম্পূর্ণ নিরামিষভোজী (Vegetarian বা Vegan), তাঁদের ক্ষেত্রে এই ভিটামিনের ঘাটতির ঝুঁকি অনেকটাই বেশি থাকে। ফলে তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বি১২-সমৃদ্ধ ফোর্টিফায়েড সিরিয়াল, ফোর্টিফায়েড সয়া বা ওটসের দুধ এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে বি১২ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।

কারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন?
বয়স্ক মানুষ, কঠোর নিরামিষভোজী ব্যক্তি, যাঁদের পেট বা অন্ত্রের নানাবিধ রোগ রয়েছে, কিংবা যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে পেটের অ্যাসিড কমানোর ওষুধ বা নির্দিষ্ট কিছু ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন করেন, তাঁদের শরীরে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
যদি আপনার শরীরে দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি ধরা, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার মতো সমস্যা বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই শরীরে ভিটামিন বি১২-এর মাত্রা সহজেই জেনে নেওয়া সম্ভব। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারে পরিবর্তন, ওষুধ কিংবা প্রয়োজনে ইনজেকশন নিতে হতে পারে। মনে রাখবেন, কেবল সাপ্লিমেন্ট সেবনই নয়, বরং সুষম খাবার, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাই ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি প্রতিরোধ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।