টুলুর সঙ্গে নাম জড়াতেই চরম ক্ষুব্ধ অনুব্রত মণ্ডল! বললেন, “মন্ত্রী ছিলাম নাকি? সব জানতেন জেলাশাসক”

রাজ্য রাজনীতিতে বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বীরভূমের এককালের প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল, যিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘পাথর সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। অত্যন্ত সাধারণ এক দিনমজুর থেকে কীভাবে তিনি শতকোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠলেন, তা নিয়ে রাজ্যজুড়ে তীব্র শোরগোল শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, বীরভূমের তৎকালীন শাসক দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল ওরফে কেষ্ট মণ্ডলের সরাসরি আশীর্বাদ ও ছত্রছায়াতেই এই বিশাল অবৈধ পাথর ও বালির কারবার ফুলেফেঁপে উঠেছিল। বারবার নিজের নাম এই বিতর্কিত আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যাওয়ায় এবার আর চুপ করে বসে থাকেননি খোদ অনুব্রত মণ্ডল। সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে তিনি চরম অসোষ্ত প্রকাশ করেছেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য একটি গভীর চক্রান্ত চলছে।
টুলু মণ্ডলের সঙ্গে নিজের সমস্ত রকম ঘনিষ্ঠতার জল্পনা সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়ে অনুব্রত মণ্ডল অত্যন্ত ক্ষুব্ধ সুরে জানিয়েছেন যে টুলুর সঙ্গে তাঁর বিন্দুমাত্র কোনো ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই এবং এই বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিবহাল নন। রাগান্বিত কণ্ঠে তিনি বলেন, টুলু মণ্ডলকে অনুব্রতর ঘনিষ্ঠ বলে তাঁর মানহানি করা হচ্ছে এবং তিনি কাউকে এক বিন্দুও ছাড়বেন না। এর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই তিনি কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মানহানির মামলার সমস্ত প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে পাথর সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগগুলোর সমস্ত দায় সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছেন তিনি। অনুব্রতর দাবি, সরকারের ঘরে কত রাজস্ব জমা পড়ছে বা উঠছে, তা দেখার দায়িত্ব পুরোপুরি জেলাশাসকের ছিল। তিনি নিজে কোনো সরকারের মন্ত্রী ছিলেন না যে তাকে এই সমস্ত হিসাব নিকাশ বা প্রশাসনিক বিষয়াদি দেখতে হবে, বরং প্রশাসনিক স্তরেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক ছিল জেলাশাসক।
তদন্তকারী সংস্থা ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা গিয়েছে যে ঠিক ২০০০ সালের আগের সময়টাতেও টুলু মণ্ডল পাথর ভাঙার ক্রাশার কারখানায় একজন সাধারণ দিনমজুর হিসেবে অত্যন্ত কষ্টের জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে ২০১০ সাল নাগাদ তিনি পুরোপুরিভাবে স্বাধীনভাবে পাথরের ব্যবসায় প্রবেশ করেন এবং অভাবনীয় সাফল্যের মুখ দেখেন। ধীরে ধীরে তিনি শত শত ভারী লরির মালিক হয়ে ওঠেন এবং বীরভূম জেলার অন্যতম বিত্তশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। অভিযোগ রয়েছে যে এই বিশেষ সময় কালেই বীরভূমের তৎকালীন সর্বময় কর্তা অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা তীব্র আকার ধারণ করে। অনুব্রতর সরাসরি আশীর্বাদ মাথায় থাকার সুবাদেই নাকি জেলার একাধিক লাভজনক টোলগেট দেখভালের সম্পূর্ণ দায়িত্ব টুলুর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, মোট সাতটি অত্যন্ত লাভজনক টোলগেট একাই নিয়ন্ত্রণ করতেন টুলু মণ্ডল, যার ফলে তাঁর আর্থিক প্রতিপত্তি এবং ব্যবসার পরিধি আকাশছোঁয়া উচ্চতায় পৌঁছায়।
তবে এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগ এবং দুর্নীতির তত্ত্বকে এক লহমায় খারিজ করে দিয়েছেন অনুব্রত মণ্ডল। টুলুর এই অভাবনীয় উত্থানের নেপথ্যে তাঁর ব্যক্তিগত হাত থাকার সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে তিনি আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটার জোরালো হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আগামী দিনে এই আইনি পদক্ষেপ এবং মানহানির মামলার হুমকি রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে কোন মাত্রা যোগ করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।