১৫৮ বছরের ঐতিহ্যে চরম ফাটল! টাটা গোষ্ঠীর বিবাদ মেটাতে অবশেষে আসরে আসলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী?

দেশের অন্যতম বৃহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ শিল্পগোষ্ঠী টাটার অন্দরের তীব্র সংঘাত নিয়ে অবশেষে মুখ খুললেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। ভারতের অর্থনীতিতে এই শতবর্ষী শিল্পগোষ্ঠীর অপরিসীম গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে, বিবাদ প্রকাশ্যে না টেনে নিজেদের অভ্যন্তরীণ আলোচনার মাধ্যমেই সমস্ত সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তি করার জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, নেতৃত্বের উচ্চপর্যায়ের পরিণতিবোধ এবং ব্যবসায়িক সৌজন্য বজায় রেখেই এই সংকটের সমাধান করা প্রয়োজন।

সোমবার মুম্বইয়ে একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। সেখানে টাটা গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ বিবাদ এবং এই স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিত কি না, সেই সংক্রান্ত জোরালো প্রশ্ন করা হয়। এর স্পষ্ট জবাবে নির্মলা সীতারামন জানান, পরিস্থিতি যতই জটিল বা গুরুতর হোক না কেন, সরকারের এখনই এই বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়া উচিত।

টাটা গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের অমূল্য ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং ভারতের শিল্প ও অর্থনীতির উন্নয়নে তাদের ঐতিহাসিক অবদানের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক স্তরে এই ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে পার্সি সম্প্রদায়ের অসামান্য অবদানের কথাও স্মরণ করেন তিনি। নির্মলার সাফ কথা, টাটা গোষ্ঠীর বিশাল গুরুত্বের কথা মাথায় রেখেই এই বিবাদ সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে মেটানো উচিত। পারিবারিক ও ব্যবসায়িক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ঠিক কী নিয়ে টাটা গোষ্ঠীতে এই চরম বিবাদ? মূলত টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং সংস্থাটির শেয়ার বাজারে নথিভুক্তি বা আইপিও আনা ঘিরেই এই সংকটের সূত্রপাত হয়েছে। বর্তমানে টাটা ট্রাস্টের হাতে টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। অন্যদিকে, শাপুরজি পালোনজি গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে প্রায় ১৮.৪ শতাংশ অংশীদারি। শেয়ার বাজারে নথিভুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে মতভেদ দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করেছে। টাটা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা এবং টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদের কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের অবস্থান এই বিষয়ে একেবারেই এক নয়।

গত ১৭ সেপ্টেম্বরের পরিচালন পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এন চন্দ্রশেখরনের চেয়ারম্যান পদে আরও পাঁচ বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ এবং সংস্থার শেয়ার বাজারে নথিভুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু নোয়েল টাটা এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। পাশাপাশি, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কঠোর নিয়ম অনুযায়ী একটি উচ্চস্তরের নন-ব্যাঙ্কিং আর্থিক সংস্থা হিসেবে টাটা সন্সের শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত করার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এই সংঘাত কেবল শেয়ার বাজারে নথিভুক্তির আইনি প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নেই। টাটা ট্রাস্টের জটিল পরিচালন পদ্ধতি, স্থায়ী ট্রাস্টি নিয়োগ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি এই পুরো বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মহারাষ্ট্রের চ্যারিটি কমিশনারের দপ্তরেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়েছে। আগামী ২৬ নভেম্বর টাটা সন্সের পরবর্তী পরিচালন পর্ষদের বৈঠককে কেন্দ্র করে নতুন করে চরম উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেই বৈঠকে সংস্থার ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন এবং শাপুরজি পালোনজি গোষ্ঠীর আর্থিক দাবিদাওয়া নিয়েও বিস্তারিত আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের স্পষ্ট বার্তা, দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো ঐতিহ্য বহনকারী এই মহীরুহ সংস্থাকে বাঁচাতে অন্দরের বিবাদ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার।