ডায়েট ছাড়াই হু হু করে কমছে ওজন? ১০টি বিপদ সংকেত এড়িয়ে গেলেই বড় বিপদের ঝুঁকি!

গলার কাছে অবস্থিত অত্যন্ত ছোট একটি গ্রন্থি হলেও শরীরের সামগ্রিক বিপাক্রিয়া বা মেটাবলিজম নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। মানবদেহের এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থিটি যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় হরমোন উৎপাদন শুরু করে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় হাইপারথাইরয়েডিজম। এই হরমোনের অস্বাভাবিক তারতম্যের কারণে মানবদেহে এমন কিছু অদ্ভুত ও জটিল লক্ষণ প্রকাশ পায়, যা অনেক সময় সাধারণ ক্লান্তি বা কাজের চাপ ভেবে অবহেলা করেন অনেকে। কিন্তু এই ভুলটিই ডেকে আনতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের এই অভ্যন্তরীণ গোলযোগের পেছনে লুকিয়ে থাকা ১০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিপদ সংকেত কখনই উপেক্ষা করা উচিত নয়:

১. হঠাৎ ওজন হ্রাস: সুনির্দিষ্ট কোনো ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই যদি মাত্র এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ৫ থেকে ৬ কেজি ওজন হঠাৎ কমে যায়, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন মেটাবলিজমের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, ফলে শরীর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ক্যালোরি পোড়াতে শুরু করে।

২. অতিরিক্ত খিটখিটে মেজাজ ও মানসিক অস্থিরতা: ছোটখাটো তুচ্ছ কারণে অতিরিক্ত রেগে যাওয়া, হাত-পা কাঁপা এবং সারাক্ষণ এক ধরণের তীব্র স্নায়ুবিক চাপ বা নার্ভাসনেস অনুভব করা এই রোগের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।

৩. বুক ধড়ফড় ও হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি: কোনো রকম শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই বিশ্রামের সময়ও যদি মনে হয় হৃৎপিণ্ড খুব দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে এবং বুক ধড়ফড় করছে, তবে সতর্ক হওয়া আবশ্যক। অনেক ক্ষেত্রেই এই পরিস্থিতিতে রোগীর পালস রেট প্রতি মিনিটে ১০০-এর উপরে চলে যায়।

৪. অতিরিক্ত ঘাম ও অসহ্য গরম লাগা: শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসেও অতিরিক্ত ঘাম হওয়া কিংবা সামান্য উষ্ণতাতেই মারাত্মক অস্বস্তি বোধ করা। শরীরে হরমোনের আধিক্যের কারণে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা সবসময় বেশি থাকে।

৫. তীব্র অনিদ্রা ও ঘুমের ব্যাঘাত: সারাদিন প্রচণ্ড ক্লান্তি বোধ হওয়া সত্ত্বেও রাতে বিছানায় যাওয়ার পর চোখের পাতা এক করতে না পারা বা হুট করে ঘুম উড়ে যাওয়া। এ সময় মস্তিষ্ক অতিরিক্ত মাত্রায় সক্রিয় ও সজাগ থাকে।

৬. ঘন ঘন মলত্যাগ বা পাতলা পায়খানা: পরিপাকতন্ত্র বা হজম প্রক্রিয়া অতিরিক্ত দ্রুতগতিতে কাজ করার কারণে দিনে একাধিকবার শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

৭. চুল ঝরে যাওয়া ও ত্বক সংবেদনশীল হওয়া: মাথার চুল অস্বাভাবিক হারে পাতলা হয়ে যাওয়া ও ঝরে যাওয়া, ত্বকের উপরিভাগ অতিরিক্ত মসৃণ ও পাতলা হয়ে যাওয়া এবং নখ সহজে ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

৮. চোখ বড় হয়ে বেরিয়ে আসা: হাইপারথাইরয়েডিজমের একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর লক্ষণ হলো চোখ দুটো স্বাভাবিকের চেয়ে বড় ও কিছুটা ঠেলে বেরিয়ে আসা, যার ফলে দৃষ্টিশক্তিও ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।

৯. পেশির দুর্বলতা ও শারীরিক কাঁপুনি: সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে মারাত্মক কষ্ট অনুভব হওয়া এবং হাত দিয়ে কোনো বস্তু ধরার সময় হাত বা আঙুল কাঁপা।

১০. মহিলাদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঋতুচক্র: নারীদের পিরিয়ডের মাত্রা হঠাৎ করে অনেক কমে যাওয়া, চক্র অনিয়মিত হয়ে যাওয়া কিংবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
আপনার শরীরের মধ্যে যদি উপরোক্ত লক্ষণগুলির মধ্যে অন্তত তিনটি লক্ষণ একসঙ্গে উপস্থিত থাকে এবং তা টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত T3, T4 এবং TSH টেস্ট করিয়ে নেওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থাতেই এই রোগ চিহ্নিত করা গেলে খুব সহজেই ওষুধ ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে থাইরয়েড সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।