পকেটে নয়, কাঁধে বইতে হতো! কেমন দেখতে ছিল বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোন?

আজকাল আমাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে স্মার্টফোন এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এটি ছাড়া একটি মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না। কল করা, ছবি তোলা থেকে শুরু করে ইন্টারনেট ব্রাউজিং—সব কাজই এখন হাতের মুঠোয়। অথচ প্রযুক্তির এই বিপ্লব শুরু হয়েছিল এমন এক যন্ত্র দিয়ে, যার আকার ও ওজনের কথা শুনলে আজ চোখ কপালে উঠবে। ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল মোটোরোলার ইঞ্জিনিয়ার মার্টিন কুপার নিউইয়র্কের রাস্তায় দাঁড়িয়ে যে প্রোটোটাইপ ফোন দিয়ে প্রথম কলটি করেছিলেন, তার প্রায় এক দশক পর বাজারে আসে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী প্রথম মোবাইল ফোন—’মোটোরোলা ডায়নাটক ৮০০০এক্স’ (Motorola DynaTAC 8000X)। আমেরিকায় ১৯৮৩ সালে এই মডেলটি অনুমোদন পাওয়ার পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে যোগাযোগের দুনিয়া।

সেকালের সেই প্রথম মোবাইল ফোনটির বাহ্যিক রূপ ছিল বর্তমান যুগের গ্যাজেটগুলির সম্পূর্ণ বিপরীত। আজকের স্লিম ও হালকা স্মার্টফোনের মতো এটিকে পকেটে পুরে ঘুরে বেড়ানোর কথা কেউ ভাবতেও পারত না। লম্বাটে আয়তাকার গড়ন, মাথার ওপর বড় একটি অ্যান্টেনা আর বেশ বড় সাইজের সব বোতাম মিলিয়ে এর ডিজাইন ছিল বেশ অদ্ভুত। অ্যান্টেনা বাদ দিলেই ডিভাইসটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৫.৫ সেন্টিমিটার, চওড়ায় ৪.৫ সেন্টিমিটার এবং পুরুত্ব ছিল প্রায় ৯ সেন্টিমিটার। বিশাল আকার এবং ভারী কাঠামোর কারণে সে সময় এই ফোনগুলোকে মূলত ‘ইট ফোন’ বা ‘ব্রিক ফোন’ বলেই ডাকতেন মানুষ। হাতে নিয়ে হাঁটাচলা করতে করতে তারহীন উপায়ে কথা বলার এই প্রযুক্তি সেই যুগে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।

দাম এবং সাধারণ মানুষের নাগালের দিক থেকেও এই ডিভাইসটি ছিল এক্কেবারে আলাদা। বাজারে আসার সময় মোটোরোলা ডায়নাটক ৮০০০এক্স-এর আকাশছোঁয়া দাম ধার্য করা হয়েছিল প্রায় ৩,৯৯৫ মার্কিন ডলার। ফলস্বরূপ, সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে এটি কেনা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। মূলত বনেদি ব্যবসায়ী কিংবা যাঁদের পেশাগত কারণে সবসময় যোগাযোগের মধ্যে থাকতে হতো, কেবল তাঁরাই এত খরচ করে এই গ্য়াজেট সংগ্রহ করতেন। নতুন প্রযুক্তির গবেষণা ও উৎপাদন খরচের উচ্চমূল্যের কারণেই এর দাম এত বেশি ছিল। এছাড়া ফোনটির ওজন ছিল প্রায় ৭৯০ গ্রাম, যা আজকের দিনে একসঙ্গে কয়েকটি স্মার্টফোন হাতে নেওয়ার সমান। ব্যাটারির পারফরম্যান্সও ছিল বেশ চমকপ্রদ; একবার সম্পূর্ণ চার্জ করতে সময় লাগত দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা, আর সেই চার্জ দিয়ে মাত্র ৩০ মিনিট কথা বলা যেত। ফোনটিতে কল করা ছাড়াও কেবল নম্বর সেভ ও রিডায়াল করার সামান্য কিছু সুবিধা ছিল। টাচস্ক্রিন, ক্যামেরা কিংবা ইন্টারনেটের মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধার লেশমাত্র ছিল না। ১৯৭৩ সালের সেই ভারী ও ব্যয়বহুল ‘ইট ফোন’ থেকে শুরু হওয়া পথচলাই আজ বিবর্তনের হাত ধরে আমাদের পকেটে আধুনিক ও সর্বময় স্মার্টফোন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।