হুন্ডি থেকে ইউপিআই: শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কীভাবে বদলেছে আপনার টাকা পাঠানোর পদ্ধতি?

আজকের যুগে স্মার্টফোনে মাত্র কয়েকটি ট্যাপ করেই নিমেষের মধ্যে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টাকা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু টাকার এই ডিজিটাল ভ্রমণের নেপথ্যে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস। বর্তমানের এই অত্যাধুনিক ইউপিআই (UPI) ব্যবস্থা হুট করে গড়ে ওঠেনি, বরং এটি শত শত বছরের বিবর্তনের একটি চূড়ান্ত ফসল।
হুন্ডি থেকেই শুরু প্রথম লেনদেনের যাত্রা
আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা আসার অনেক আগেই ভারতে প্রচলিত ছিল ‘হুন্ডি’। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১২শ শতাব্দী থেকেই এই ক্রেডিট ইনস্ট্রুমেন্টটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। ব্যবসায়ীরা তখন নগদ টাকা বয়ে না নিয়ে হুন্ডির মাধ্যমেই দূরবর্তী অঞ্চলে অর্থ লেনদেন, ঋণ গ্রহণ ও বাণিজ্যের হিসাব সম্পন্ন করতেন। ‘দর্শনী হুন্ডি’ ছিল চাহিদা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক পরিশোধের উপায়, আর ‘মুদ্দতি হুন্ডি’ কাজ করত নির্ধারিত মেয়াদী চেকের মতো।
আধুনিক ব্যাংকিংয়ের ভিত্তি স্থাপন
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের গোড়াপত্তন হয়। ১৮০৬ সালে ব্যাংক অফ বেঙ্গল, ১৮৪০ সালে ব্যাংক অফ বোম্বে এবং ১৮৪৩ সালে ব্যাংক অফ মাদ্রাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে ১৯২১ সালে ‘ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া’য় রূপান্তরিত হয়। ১৯৩৫ সালে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও নোট ছাপানোর একক দায়িত্ব শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় এই নতুন ব্যাংকিং পরিকাঠামো ও পুরনো হুন্ডি নেটওয়ার্ক পাশাপাশি কাজ করছিল।
আাম জনতার কাছে ব্যাংকিংয়ের প্রসার
স্বাধীনতার পর আমজনতাকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ১৯৫৫ সালে ইম্পেরিয়াল ব্যাংককে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (SBI)-তে রূপান্তর করা হয়। ১৯৬৯ ও ১৯৮০ সালে একের পর এক বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকের জাতীয়করণ করা হয়। এর ফলে ১৯৬৯ সালে যেখানে মাত্র ৮,২৬২টি ব্যাংক শাখা ছিল, তা ১৯৯০ সালের মার্চ মাসে ৫৯,৭৫২টিতে উন্নীত হয়। গ্রামীণ এলাকায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ‘লিড ব্যাংক স্কিম’ ও ‘আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইলেকট্রনিক লেনদেনের যুগ
নব্বইয়ের দশকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এল বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ২০০৪ সালে আরটিজিএস (RTGS) এবং ২০০৫ সালে এনইএফটি (NEFT) চালুর মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার সহজতর হয়। ২০০৭ সালের ‘পেমেন্ট এন্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট’ এক মজবুত আইনি ভিত্তি প্রদান করে। ২০০৮ সালে এনপিসিআই (NPCI) এবং ২০১০ সালে আইএমপিএস (IMPS)-এর আবির্ভাব ঘটে, যা ২৪/৭ তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ করে দেয়।
ডিজিটাল বিপ্লবের মূল ভিত্তি
২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী জন-ধন যোজনা ঘোষণার মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন অধ্যায় শুরু হয়। জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৫৮.৮৪ কোটি সুবিধাভোগী এই প্রকল্পের আওতায় এসেছেন এবং কোটি কোটি রুপে ডেবিট কার্ড বিলি করা হয়েছে। আধার, মোবাইল সংযোগ এবং জন-ধন অ্যাকাউন্ট—এই তিনের মেলবন্ধনেই তৈরি হয় আজকের ডিজিটাল আর্থিক কাঠামোর শক্তিশালী ভিত।
ইউপিআই: সেকেন্ডের কারিগরি
২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আরবিআই গভর্নর রঘুরাম রাজন ইউপিআই-এর পাইলট লঞ্চ করেন। এটি বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাকাউন্টকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে এনে তাৎক্ষণিক লেনদেন সহজ করে তোলে। এই সাফল্যের পরিধি অকল্পনীয়—জুলাই ২০২৬-এ ইউপিআই-এর মাধ্যমে ২৩.৬৬ আরব লেনদেন হয়েছে, যার মোট মূল্য ২৯.৮৮ লক্ষ কোটি টাকা।
যুগের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু মূল উদ্দেশ্য একই ছিল—টাকাকে নিরাপদে ও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো। হুন্ডি থেকে আজকের ইউপিআই—ভারতের এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, উদ্ভাবন আর আস্থার সংমিশ্রণই পারে বিশ্বকে বদলে দিতে।