“হাঁড়ি উল্টে দিয়েছিল তৃণমূল”-১০ বছর পর প্রথম গ্রাস মুখে তুললেন কোচবিহারের সুভাষ

রাজনীতি যে কেবল ভোট আর ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং কারও কারও কাছে চরম জেদ আর অপমানের বদলা নেওয়ার মাধ্যম হতে পারে, তার নজির গড়লেন কোচবিহারের সুভাষ বর্মন। দীর্ঘ ১০ বছর অন্ন ত্যাগ করে থাকার পর, অবশেষে রবিবার এক আবেগঘন পরিবেশে মুখে ভাত তুললেন শীতলকুচি ব্লকের এই একনিষ্ঠ বিজেপি কর্মী। বাংলায় বিজেপির ক্ষমতায় আসার দিনটির জন্যই প্রতীক্ষায় ছিলেন তিনি।

কী সেই ইতিহাস? কেন এই ‘ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা’? ঘটনার সূত্রপাত ২০১৬ সালের কোচবিহার লোকসভা উপনির্বাচনের সময়। শীতলকুচির ভাবৈরথানা গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা সুভাষ বর্মন তখন বিজেপির পোলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। অভিযোগ, ভোটের ফল প্রকাশের পরেই তাঁর বাড়িতে হামলা চালায় তৎকালীন শাসকদলের আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। সুভাষবাবুর দাবি, বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের পাশাপাশি উনুন থেকে রান্নার হাঁড়ি নামিয়ে উল্টে দেওয়া হয়েছিল। মাটিতে মিশে গিয়েছিল ধবধবে সাদা ভাত।

ভাতের সেই অপমান সহ্য করতে পারেননি সুভাষ। সেই দিনই তিনি শপথ নিয়েছিলেন, যতদিন না বাংলায় বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসছে, ততদিন তিনি আর যাই হোক, ভাত মুখে তুলবেন না।

১০ বছরের লড়াই ও নীরব প্রতিবাদ ২০১৬ থেকে ২০২৬— এই এক দশকে অনেক রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই দেখেছে বাংলা। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে বিজেপির ব্যাপক সাফল্য এলেও নবান্ন দখল সম্ভব হয়নি। নিজের প্রতিজ্ঞায় অটল সুভাষবাবু তখনও ভাত ছোঁননি। রুটি বা অন্য খাবার খেয়েই দিন গুজরান করেছেন তিনি। স্মৃতি হিসেবে সযত্নে আগলে রেখেছিলেন সেই দিনের সেই ভাঙা হাঁড়িগুলো, যা আজও তাঁর ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির এক কোণে পড়ে রয়েছে।

অবশেষে স্বপ্নপূরণ চলতি বছরের ৪ মে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় বদল এসেছে। ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। আর প্রিয় দলের এই জয়েই নিজের জয় খুঁজে পেয়েছেন সুভাষ বর্মন। রবিবার আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং দলীয় কর্মীদের উপস্থিতিতে ১০ বছর পর প্রথমবার থালায় ভাত সাজিয়ে বসলেন তিনি।

চোখে জল নিয়ে সুভাষ বর্মন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সেই দিনের সেই অপমান আমি কোনওদিন ভুলতে পারিনি। আজ মনে হচ্ছে আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তাই আবার সবার সঙ্গে বসে খাওয়ার সময় এসেছে।”

বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে সুভাষ বর্মনের এই ব্যক্তিগত প্রতিবাদ এবং অবিশ্বাস্য ধৈর্য এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ১০ বছর পর ভাতের প্রথম গ্রাসটি যখন তিনি মুখে তুললেন, তখন তাঁর চারপাশ ঘিরে ছিল উৎসবের মেজাজ। শীতলকুচির মানুষের কাছে সুভাষ এখন কেবল এক রাজনৈতিক কর্মী নন, বরং এক হার না মানা প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy