সুযোগ নষ্টের খেসারত! ইস্টবেঙ্গলকে ১-০ গোলে হারিয়ে ডার্বি জিতল সবুজ-মেরুন ব্রিগেড

মেট্রোর টানেল থেকে বেরিয়ে যুবভারতীর পথে পা বাড়াতেই বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল একটাই শব্দ— ডার্বি। দুই শিবিরের সমর্থকদের গর্জনে চারপাশ কেঁপে উঠলেও, বর্ষার মেঘলা আকাশের নীচে যুবভারতী স্টেডিয়াম পরিণত হয়েছিল এক আবেগের মহাঞ্চল্যে। গ্যালারি প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ থাকলেও, খেলা শুরুর পর প্রথমার্ধে সেই উত্তেজনার আগুন যেন কিছুটা স্তিমিত ছিল। দুই দলই নতুন কোচের অধীনে নামায় এবং প্রস্তুতির সময় কম থাকায় প্রথমার্ধে ডার্বির পরিচিত ঝাঁজ বা ছন্দের দেখা মিলছিল না। তবে দ্বিতীয়ার্ধে একের পর এক আক্রমণ, একটিমাত্র দুর্দান্ত গোল এবং বিশাল কাইথের অবিশ্বাস্য রূপকথার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ডুরান্ড কাপের সৌজন্যে মরশুমের প্রথম ডার্বি জিতে নিল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। ০-১ গোলে হার মানতে হলো আইএসএল (ISL) চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল FC-কে।

এক ঝলকে প্রতিবেদনের মূল বিষয়সমূহ:

  • প্রথমার্ধের ফিকে চিত্র: দুই নতুন কোচের অধীনে কম প্রস্তুতির কারণে প্রথম ৪৫ মিনিটে ছন্দ ও গোলের সুযোগের অভাব ছিল স্পষ্ট।

  • সাহালের জাদুকরী গোল: ৫২ মিনিটে কিয়ানের প্রেসিং এবং মনবীরের পাস থেকে বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় গোল করেন সাহাল আব্দুল সামাদ।

  • হাবাসের পরিবর্তন ও ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণ: পিছিয়ে পড়ে আন্তোনিও লোপেজ হাবাস একাধিক বদলি নামালেও গোলের দেখা পায়নি লাল-হলুদ।

  • বিশাল কাইথের অবিশ্বাস্য দেয়াল: ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে ইস্টবেঙ্গলের একের পর এক নিশ্চিত আক্রমণ রুখে মোহনবাগানকে জয় এনে দেন গোলরক্ষক বিশাল কাইথ।

  • হাবাসের প্রথম ডার্বি হার: ইস্টবেঙ্গল ডাগআউটে বসে প্রথমবার ডার্বি হারলেন কোচ হাবাস, অন্যদিকে নতুন কোচ পানাগিওটিস দিলমপেরিসের প্রথম ডার্বিই জয় দিয়ে শুরু হলো।

সাহালের এক ছোঁয়ায় বদলে গেল ম্যাচ

গোলশূন্য ও অনুজ্জ্বল প্রথম অর্ষের পর খেলার মোড় ঘুরে যায় ৫২ মিনিটে। কিয়ান নাসিরির দুর্দান্ত প্রেসিং থেকে তৈরি হয় আক্রমণ। ডান দিক থেকে তাঁর বাড়ানো বল মনবীর সিংয়ের পা ছুঁয়ে নিখুঁতভাবে পৌঁছে যায় সাহাল আব্দুল সামাদের পায়ে। সামনে ফাঁকা জায়গা পেয়ে কোনো ভুল করেননি মোহনবাগানের এই মিডফিল্ডার; আলতো ও ঠান্ডা মাথার শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। গ্যালারিতে থাকা সবুজ-মেরুন সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।

আক্রমণ করেও গোল পেল না ইস্টবেঙ্গল

পিছিয়ে পড়ার পর ডাগআউটে বসে থাকেননি ইস্টবেঙ্গল কোচ আন্তোনিও লোপেজ় হাবাস। রোহিত কুমার ও রোহিত দানুকে তুলে মাঠে নামান পিভি বিষ্ণু এবং রশিদকে। এরপরে ডেভিডের পরিবর্তে নামেন দানি রামিরেজ়। এই বদলের পরেই বদলে যায় ম্যাচের গতিপ্রকৃতি। এডমুন্ড একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকেন। বিষ্ণুর ক্রসে রামিরেজের শট পোস্টে লাগে, রসিদ গোলের সামনে থেকেও সুযোগ হাতছাড়া করেন। লালচুংনুঙ্গা, এডমুন্ড থেকে বিষ্ণু— সকলের পায়েই সুযোগ এলেও গোলের দেখা মেলেনি। কারণ মোহনবাগান গোলপোস্টের নিচে তখন পাহাড় প্রমাণ আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বিশাল কাইথ।

বিশাল কাইথের অবিশ্বাস্য বীরত্ব

স্কোরবোর্ড হয়তো বলবে মোহনবাগান ১-০ জিতেছে, কিন্তু ম্যাচের আসল নায়ক ছিলেন বিশাল কাইথ। ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে ইস্টবেঙ্গল আক্রমণ ঝড়ের রূপ নিয়েছিল। বিষ্ণুর জোরালো শট, এডমুন্ডের গতি কিংবা রামিরেজ়ের পোস্টে লাগা শট— সবকিছুর সামনে প্রাচীরের মতো রুখে দাঁড়ান বিশাল। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই পরিষ্কার হয়ে যায়, এ কেবল সাহালের গোলের জয় নয়, এই জয় বিশাল কাইথের অদম্য আত্মবিশ্বাসেরও।

ম্যাচ শেষে যুবভারতীর দুই প্রান্তে দেখা গেল সম্পূর্ণ বিপরীত দুই ছবি। নরওয়ের তারকা আর্লিং হাল্যান্ডদের বিখ্যাত ‘ভাইকিং রো’ সেলিব্রেশনে মেতে ওঠেন মোহনবাগান সমর্থকরা। অন্যদিকে, বহু সুযোগ তৈরি করেও গোল না পাওয়ার হতাশায় স্তব্ধ হয়ে যায় লাল-হলুদ গ্যালারি। ডার্বির রাত শেষ হলেও, কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের মনে এই নাটকীয় লড়াই অনেক দিন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।