সিনেমার গল্পকেও হার মানাল অসমের মাঝির সাহস! একা হাতে বাঁচালেন ৪০০ জনের প্রাণ!

চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকেও হার মানাল বাস্তবের এক রূপকথার মতো অসম সাহসী মানবিক লড়াইয়ের ঘটনা। অসমের এক প্রত্যন্ত গ্রামের এক অতি সাধারণ গরিব ডিঙি নৌকার মাঝি আজ সাধারণ মানুষের কাছে সাক্ষাৎ ঈশ্বরের দূত এবং বাস্তবের ‘বজরঙ্গি ভাই’। বজরঙ্গি রাজভর নামের এই বীর মাঝির বাড়ি অসমের প্রত্যন্ত পাহাড় ঘেরা বিহুবর এলাকার নেপালি কুঠি গ্রামে। গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে উত্তাল দিখৌ নদী। এই নদীর ওপরেই নির্ভর করত বজরঙ্গির জীবন-জীবিকা। নদীর জলে ভেসে আসা কাঠ কুড়ানো থেকে শুরু করে মাছ ধরা ও গবাদি পশু পালন ছিল তাঁর প্রতিদিনের পেশা।
গত ১৯ জুলাই অন্যান্য দিনের মতোই নদীতে কাঠ কুড়াতে গিয়েছিলেন বজরঙ্গি। আচমকাই তিনি লক্ষ্য করেন নদীর জল অস্বাভাবিক পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিপদ বুঝে তিনি দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পুরো গ্রাম জলের তলায় তলিয়ে যায়। চারিদিকে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতার জলের তীব্র স্রোত এবং পলকের মধ্যে গৃহহীন হয়ে পড়েন হাজার হাজার মানুষ। প্রাণ বাঁচাতে নিরুপায় গ্রামবাসীরা নিজেদের ঘরের চালে এবং গাছের ডালে আশ্রয় নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। চারদিকে তখন শুধু অসহায় মানুষের বাঁচার আকুল আর্তনাদ।
পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ দেখে বজরঙ্গি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে নিজের ছোট ডিঙি নৌকাটি নিয়ে বাড়িতে পৌঁছন। নিজের স্ত্রীকে ঘরের ভাঙা জানলার ওপর নিরাপদ দূরত্বে বসিয়ে রেখে, গ্রামবাসীদের সেই বুকফাটা আর্তনাদ শুনে আর স্থির থাকতে পারেননি তিনি। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে তিনি নৌকা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধারকাজে। বিপর্যয় এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, উদ্ধারকাজে নিয়োজিত এসডিআরএফ (SDRF) দল তখনও গ্রামে পৌঁছাতে পারেনি। যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি দল ব্যর্থ হলো, সেখানে ত্রাতা হয়ে উঠলেন এই সাধারণ মাঝি।
প্রবল জলের স্রোতের মধ্যে নিজের জীবন কার্যত হাতের মুঠোয় নিয়ে ডিঙি নৌকা বেয়ে এগিয়ে চলেন বজরঙ্গি। ঘরের চালের ওপর ও গাছের ডালে বসে থাকা মহিলা, শিশু-সহ একাধিক মানুষকে একে একে উদ্ধার করেন তিনি। মৃত্যু যাদের থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে ছিল, তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনেন। বজরঙ্গির এই একক সাহসিকতা দেখে পরবর্তীতে তাঁর সাথে যোগ দেন ২৫ বছর বয়সী স্থানীয় ব্যবসায়ী শ্রবণ প্রসাদ এবং রবি প্রসাদসহ আরও বেশ কিছু স্থানীয় মাঝি। তাঁরা আরও ৫টি ডিঙি নৌকা নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন। সব মিলিয়ে মোট ৬টি ডিঙি নৌকা নিয়ে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান।
প্রবল জলের স্রোতের সাথে লড়াই করে একা বজরঙ্গি প্রায় ৪০০-রও বেশি মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করেন। পাশাপাশি, নিজেদের প্রাণ বাজি রেখে এই পুরো দলটি ৬টি ডিঙি নৌকা নিয়ে আশেপাশের মোট ৬টি গ্রাম থেকে প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ জন মানুষকে সুরক্ষিতভাবে উদ্ধার করে এক অনন্য মানবিক নজির সৃষ্টি করেন। ১৯ জুলাইয়ের সেই অভিশপ্ত দিনের প্রলয়ঙ্কারী বন্যার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের বুক চিতিয়ে লড়ে বিহুবরের ‘আসল নায়ক’ হয়ে উঠলেন বজরঙ্গি রাজভর এবং তাঁর সহযোদ্ধারা। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে সেই ভয়াবহ দিনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বজরঙ্গি। তিনি জানান, উদ্ধার কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই তিনি তাঁর স্ত্রীকে জীবিত পেতেন না। এই সাধারণ মাঝির অসামান্য মানবিকতা ও সাহসিকতাকে আজ কুর্ণিশ জানাচ্ছে গোটা দেশ।