সিআইএ এজেন্ট সেজে কোটি কোটি ডলারের হাতছানি! লখনউয়ের ‘মিস্টার জি’-র অসাধ্য সাধন?

থ্রিলার সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায় এই ঘটনা। পরিচয় গোপন করে আস্থা অর্জন, এরপর উচ্চপদস্থ মহলের করিডোরে অবাধ প্রবেশ এবং শেষে কোটি কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি হাতিয়ে নেওয়ার ছক! সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে এমন এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির খবর প্রকাশ্যে এসেছে, যা দেখে স্তম্ভিত বিশ্ব রাজনীতি। লখনউয়ে জন্ম নেওয়া এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী, গৌরব শ্রীবাস্তব নিজেকে সিআইএ (CIA) এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর মতো হেভিওয়েট নেতার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্টের (OCCRP) সাম্প্রতিক রিপোর্টে এই প্রতারণার খুঁটিনাটি সামনে এসেছে।
গৌরব শ্রীবাস্তব, যিনি পরিচিত ছিলেন ‘মিস্টার জি’ নামে, লখনউ থেকে পাড়ি দিয়েছিলেন আমেরিকায়। সেখানেই তিনি নিজের জাল বিস্তার করেন। ২০২০ সালে যখন প্রাবোও সুবিয়ান্তো ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তখন থেকেই তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন গৌরব। ওয়াশিংটন ডিসি এবং জাকার্তায় আয়োজিত একাধিক উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা বৈঠকে তিনি আমন্ত্রিত থাকতেন। যুদ্ধবিমান ও অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কেনার প্রতিটি আলোচনায় গৌরবের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই সম্মানের আড়ালে ছিল এক সুগভীর ষড়যন্ত্র।
এই জালিয়াতির মোড় ঘোরে গৌরব শ্রীবাস্তবের প্রাক্তন ব্যবসায়িক অংশীদার নিলস ট্রুস্টের মামলার হাত ধরে। ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ ইয়র্কের আদালতে দায়ের করা ওই মামলার নথি থেকে জানা যায়, গৌরবের আসল পরিচয় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফোনালাপের রেকর্ডিং থেকে প্রমাণ মেলে যে, তিনি সিআইএ-র সদস্য হওয়ার ভুয়া দাবি করে ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ সরকারি আধিকারিকদের বিভ্রান্ত করতেন। নিজের মিথ্যে প্রভাব জাহির করতে তিনি দাবি করেছিলেন যে, ২০০২ সালের বালি জঙ্গি হামলার নেপথ্যের অপরাধীদের খুঁজে বের করা বা খোদ প্রেসিডেন্ট সুবিয়ান্তোর নাম মার্কিন অভিবাসন সংক্রান্ত ব্ল্যাক লিস্ট থেকে সরাতেও তাঁর ‘বিশেষ ভূমিকা’ ছিল।
এই মিথ্যে পরিচয় ব্যবহার করেই গৌরব প্রতিরক্ষা খাতে একের পর এক চুক্তি বাগাতে থাকেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শ্রীবাস্তব-ঘনিষ্ঠ চারটি সংস্থা ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থার সঙ্গে পাঁচটি বিশাল প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মধ্যে ছিল ৩৬টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার, সি-১৩০ পরিবহন বিমান এবং সামরিক কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার নির্মাণের মতো বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প। ২০২২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার যখন ১৩.৯ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমান চুক্তির অনুমোদন দেয়, তখন শ্রীবাস্তবের হাত ধরেই এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা মহলে প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে এতো বড় মাপের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈঠকে একজন ভুয়া এজেন্ট এতো সহজে প্রবেশাধিকার পেলেন? এই ঘটনা কি শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নাকি এর পেছনে কোনো বড় আন্তর্জাতিক চক্র কাজ করছে? উত্তর পেতে তদন্তের জাল গুটাচ্ছেন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দারা। আপাতত বিশ্বের নজর এখন সেই ‘মিস্টার জি’-এর দিকে, যিনি ভারতীয় লখনউ থেকে উঠে এসে বিশ্ব রাজনীতির করিডোরে রীতিমতো ভূমিকম্প তৈরি করে দিয়েছেন।