সাহিত্য থেকে সমাজ, এক জীবনব্যাপী লড়াইয়ের শেষ! প্রয়াত কন্নড় সাহিত্যিক এস এল ভৈরপ্পা

পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত কন্নড় সাহিত্যের অন্যতম কিংবদন্তি লেখক শান্তেশিভরা লিঙ্গান্নাইয়া ভৈরপ্পা (এস এল ভৈরপ্পা) ৯৪ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন। ২৪ সেপ্টেম্বর, বুধবার দুপুর ২:৩৮ মিনিটে বেঙ্গালুরুর রাজরাজেশ্বরী নগরের রাষ্ট্রোত্থান হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর কালজয়ী সাহিত্যকর্ম শুধু কন্নড় সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শনকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি দিয়েছে। তাঁর প্রয়াণে সাহিত্যপ্রেমী এবং অনুরাগীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শোকবার্তা:
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এস এল ভৈরপ্পার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, “এস এল ভৈরপ্পা জির প্রয়াণে আমরা এমন এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বকে হারালাম, যিনি আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছেন এবং ভারতের আত্মাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। একজন নির্ভীক এবং কালজয়ী চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি তাঁর গভীর রচনা দিয়ে কন্নড় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর লেখা বহু প্রজন্মকে চিন্তাভাবনা করতে, প্রশ্ন করতে এবং সমাজের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করেছে।”

দারিদ্র্য থেকে সাহিত্যের শিখরে উত্থান:
১৯৩১ সালের ২০ আগস্ট কর্ণাটকের হাসান জেলার শান্তেশিভরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভৈরপ্পা। প্লেগের মতো মহামারীর কঠিন সময়ে তাঁর শৈশব কাটে দারিদ্র্য এবং অভাবের মধ্যে। মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি মহীশূরে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্বর্ণপদক নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর, তিনি গুজরাটের মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ডক্টরেট লাভ করেন। এরপর, ৩০ বছর ধরে তিনি দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৯৯১ সালে অবসর গ্রহণের পর তিনি মহীশূরে স্থায়ী হন এবং তাঁর সাহিত্য সাধনাকে আরও গতি দেন।

সাহিত্যকর্ম: মহাকাব্যের জীবন্ত চিত্রণ
৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাহিত্যচর্চা করে ভৈরপ্পা ২৫টিরও বেশি উপন্যাস লিখেছেন, যার মধ্যে ‘বংশবৃক্ষ’, ‘দাতু’, ‘পর্ব’, ‘আভরণ’, ‘মন্দার’ এবং ‘গৃহভঙ্গ’-এর মতো কালজয়ী রচনাগুলো উল্লেখযোগ্য। তাঁর উপন্যাসগুলোতে ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি, দর্শন এবং মানব অনুভূতির গভীর বিশ্লেষণ দেখা যায়। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত উপন্যাস ‘পর্ব’-তে তিনি মহাভারতের সামাজিক কাঠামো, মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেন। তাঁর বেশ কয়েকটি উপন্যাস যেমন ‘বংশবৃক্ষ’, ‘তব্বালিয়ু নিন্নাডে মাগনে’ এবং ‘মটদানা’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, অন্যদিকে ‘গৃহভঙ্গ’ এবং ‘দাতু’ টিভি সিরিয়ালে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর রচনা ১৪টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং সেগুলো বেস্টসেলার হয়েছে।

পুরস্কার ও সম্মান:
সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য ভৈরপ্পা বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১০ সালে সরস্বতী সম্মান, ২০১৫ সালে সাহিত্য একাডেমি ফেলোশিপ, ২০১৬ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০২৩ সালে পদ্মভূষণ। ২০২৩ সালে পদ্মভূষণ পাওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, “আমি এই পুরস্কার পেয়েছি কারণ নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী। যদি তিনি না থাকতেন, তাহলে হয়তো আমি এই সম্মান পেতাম না।” তিনি এই সম্মান মহীশূরের মানুষকে উৎসর্গ করেছিলেন।