সার সংকটের দিন শেষ! খরিফ মরশুমে কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে লক্ষ লক্ষ টন সার আমদানি করল মোদী সরকার

খরিফ মরশুমে দেশের অন্নদাতা কৃষকরা যাতে কোনোভাবেই সার বা উর্বরের তীব্র ঘাটতির মুখোমুখি না হন, তা সুনিশ্চিত করতে এবার অত্যন্ত বড় এবং দূরদর্শী পদক্ষেপে সার আমদানির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্র সরকার। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিক অর্থাৎ গত এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে ভারত বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করেছে। এর মধ্যে মোট ২৫.০৮ লক্ষ টন ইউরিয়া এবং ৭.১১ লক্ষ টন ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি (DAP) সফলভাবে দেশে নিয়ে আসা হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের ভাষ্যমতে, দেশের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান কৃষিপণ্যের চাহিদা নির্বিঘ্নে মেটাতে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কৃষকদের হাতে প্রয়োজনীয় সার পৌঁছে দিতেই এই সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি লোকসভায় পেশ করা এক লিখিত সরকারি জবাবে কেন্দ্রীয় রাসায়নিক ও সার মন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডা (জে.পি. নাড্ডা) অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, আলোচ্য এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে দেশের নিজস্ব কারখানাগুলিতে মোট ১১৫.৭২ লক্ষ টন সার উৎপাদিত হয়েছে। এই বিশাল উৎপাদনের মধ্যে প্রায় ৭১.৫৫ লক্ষ টন ইউরিয়া এবং ৯.৮৪ লক্ষ টন ডিএপি সার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে দাবি করা হয়েছে যে, একদিকে দেশের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং অন্যদিকে সুচারু আমদানির সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমেই দেশজুড়ে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
গত বছরের সার্বিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারত সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো সময়জুড়ে প্রায় ১০.৩৫ মিলিয়ন টন ইউরিয়া এবং ৬.১৯৪ মিলিয়ন টন ডিএপি আমদানি করেছিল। পাশাপাশি, ঠিক একই সময়কালে দেশের সামগ্রিক সার উৎপাদন ছিল রেকর্ড ৫১.৭৭৪ মিলিয়ন টন। এই পরিসংখ্যানগুলি থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, দেশজুড়ে কৃষিপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে সরকার কেবল অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপরই নির্ভর করে বসে নেই, বরং সুচিন্তিতভাবে আমদানির পথও প্রশস্ত রাখছে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার বাজারে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত একপেশে নির্ভরতা কমানো এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সম্ভাব্য যেকোনো মারাত্মক ব্যাঘাত এড়াতে ভারত সরকার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আমদানির উৎস সন্ধান ও তৈরি করে চলেছে। মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা তাঁর বক্তব্যে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, সার বিভাগ বিদেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসগুলির সঙ্গে নিবিড় ও সক্রিয় সহযোগিতার মাধ্যমে চীনের ওপর থেকে একচ্ছত্র নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য বিকল্প আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার আমদানির পথ সুগম করেছে।
বিশেষ করে, চীন যখন আকস্মিকভাবে ভারতে বিশেষ কিছু ক্যাটাগরির সারের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করে দিয়েছিল, তখন দেশের ভারতীয় সার কোম্পানিগুলি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বেলজিয়াম, মিশর, জার্মানি, মরক্কো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিকল্প দেশগুলি থেকে পানিতে দ্রবণীয় সার বা ওয়াটার সলিউবল ফার্টিলাইজারের আমদানি ব্যাপক পরিমাণে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চীন থেকে সার আমদানি হ্রাসের নেতিবাচক প্রভাব ভারতীয় বাজারে অনেকাংশেই সফলভাবে প্রশমিত করা সম্ভব হয়েছে।
শুধু বিকল্প বাজার অন্বেষণই নয়, দেশের দীর্ঘমেয়াদী সার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদনকারী দেশ যেমন সৌদি আরব এবং রাশিয়ার সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারত। ভারতীয় রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি সার প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে বার্ষিক প্রায় ৩.১ মিলিয়ন টন ডিএপি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এছাড়াও, চলতি বছরে প্রায় ২.৬৫ মিলিয়ন টন ডিএপি এবং এনপিকে (NPK) সার আমদানির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রেখে রুশ কোম্পানিগুলির সঙ্গেও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
পাশাপাশি, কৃষিকাজে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মিউরিয়েট অফ পটাশ বা এমওপি (MOP)-এর নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে চলতি বছরে রাশিয়া, জার্মানি এবং তুর্কমেনিস্তান থেকে মোট ৪.৮০ লক্ষ টন এমওপি আমদানির চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে মনে করছেন যে, সময়োচিত এই আমদানি নীতি, দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতার লাগাতার বৃদ্ধি এবং বিশ্বের একাধিক নির্ভরযোগ্য দেশের সঙ্গে করা দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ চুক্তিগুলির কারণে আসন্ন খরিফ ও রবি মরশুমে দেশের অন্নদাতাদের আর সারের চরম ঘাটতির মুখে পড়তে হবে না। সর্বোপরি, সরকারের এই সুদূরপ্রসারী কৌশল বিশ্ব বাজারে যেকোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও দেশের মাটিতে সারের সরবরাহ ও খাদ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।