ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মাঝেই চরম বিপদ! রাশিয়ান হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর পরেই জরুরি নির্দেশিকা প্রকাশ সরকারের

ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা যখন চরম আকার ধারণ করেছে, ঠিক তখনই কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলে নতুন করে মারাত্মক নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে লক্ষ্য করে লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে। এর জেরে গত কয়েকদিনে বাণিজ্যিক জাহাজে সংঘটিত ভয়াবহ হামলায় বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনা সামনে এসেছে, যা শুধু নিহতদের পরিবারেই নয়, বরং সমগ্র দেশজুড়ে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ভারত সরকার অবিলম্বে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠোর কনস্যুলার অ্যাডভাইজরি বা নির্দেশিকা জারি করেছে। এই নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলে চলাচলকারী যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বর্তমানে তীব্র ও অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার গুরুতর ঝুঁকির মুখে রয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে এই অঞ্চলে এই ধরনের আক্রমণাত্মক ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং অত্যন্ত দুসংবাদের বিষয় হলো যে এই আকস্মিক হামলাগুলিতে ইতোমধ্যে পাঁচজন ভারতীয় নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
এই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার দেশের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে বিশেষ কিছু সতর্কতামূলক পরামর্শ প্রদান করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে সুপারিশ করা হয়েছে যে, কোনো ভারতীয় নাগরিক যদি বর্তমান পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক জাহাজে চাকরির অফার গ্রহণ করতে চান বা কাজের সুবাদে ওই নির্দিষ্ট জলপথে ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে যাত্রার পূর্বে সংশ্লিষ্ট জাহাজের রুট বা যাত্রাপথ সম্পর্কিত সমস্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে নেওয়া উচিত। সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে যে, নিয়োগকর্তা, রিক্রুটিং এজেন্সি বা ম্যানিং এজেন্ট এবং জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলির উচিত নাবিকদের জাহাজের সুনির্দিষ্ট যাত্রাপথের বিবরণ, যাত্রাপথে যে সমস্ত বন্দরে জাহাজ ভিড়বে তার পরিষ্কার তথ্য, জাহাজে উপলব্ধ জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য বীমা কভারেজ এবং যেকোনো বিপদের দিনে জরুরি অবস্থার মোকাবিলা করার পরিকাঠামো সম্পর্কে সম্পূর্ণ ও স্বচ্ছ তথ্য প্রদান করা।
শুধু তাই নয়, সরকারি নির্দেশিকায় চাকরির চুক্তিপত্রে যাতে চিকিৎসা সেবা, জরুরি ভিত্তিতে মেডিকেল ইভ্যাকুয়েশন বা স্থানান্তর, নিরাপদে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের মতো অত্যন্ত জরুরি বিষয়গুলির সুস্পষ্ট এবং আইনি ব্যবস্থা থাকে, তা নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে নাগরিকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, তাঁরা যেন তাঁদের সমুদ্রযাত্রার সময়সূচী এবং সম্পূর্ণ জাহাজের পথ বা রুট সম্পর্কে তাঁদের নিজ নিজ পরিবারকে আগে থেকেই বিস্তারিত জানিয়ে রাখেন এবং নিয়মিতভাবে পরিবারের সঙ্গে নিরাপদ যোগাযোগ বজায় রাখেন। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের ইন্ডিয়ান মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGMA) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারি করা সমস্ত সুরক্ষা নির্দেশিকা ও প্রোটোকল কঠোরভাবে মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে, গত ২৩ জুলাই, ২০২৬ তারিখে ডিজিএমএ-র পক্ষ থেকে যে বিশেষ সুরক্ষা পরামর্শ বা সিকিউরিটি অ্যাডভাইজরি জারি করা হয়েছিল, তা সকল ভারতীয় নাবিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিখুঁতভাবে অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে, কোনো ভারতীয় নাগরিকের যদি আকস্মিক কনস্যুলার সহায়তার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে তাঁরা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করতে পারেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ভারতীয় নাগরিকদের নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা প্রদান করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রাশিয়া এবং ইউক্রেনে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসগুলির ডেডিকেটেড হেল্পলাইন নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে। জানানো হয়েছে যে, রাশিয়ায় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের হেল্পলাইন নম্বর হলো +৭ ৯৬৫২৭৭৩৪১৪ এবং ইউক্রেনে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের হেল্পলাইন নম্বর হলো +৩৮ ০৯৩৩৫৫৯৯৫৮। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে ভারতীয় নাগরিকরা বা তাঁদের পরিবার এই নম্বরগুলিতে যোগাযোগ করতে পারবেন।