বাঁকিপুরে মোদীর সেনার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক হুংকার! প্রশান্ত কিশোরের মেগা চ্যালেঞ্জে কেঁপে উঠল রাজনৈতিক মহল

জন সুরজ-এর প্রধান এবং বাঁকিপুর উপনির্বাচনের অন্যতম চর্চিত প্রার্থী প্রশান্ত কিশোর রবিবার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও அதிரূপপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। এই বিশেষ বৈঠকে তিনি বাঁকিপুর উপনির্বাচনে শাসক দল বিজেপির পক্ষে জীবিকা দিদিদের জোরপূর্বক প্রচারের কাজে ব্যবহারের ওপর অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা জারির দাবি জানান। পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা এবং দেশজুড়ে উত্তাল হয়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গেও অত্যন্ত কড়া ভাষায় আক্রমণ শানান। প্রশান্ত কিশোর স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, কেবল নির্বাচন কমিশনে প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে বা প্রেস কনফারেন্স করে তাঁরা ঘরে বসে থাকবেন না। বিজেপি যদি তাদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য ১,০০০ কর্মী, নেতা এবং তারকা প্রচারকদের মাঠে নামায়, তবে তা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি প্রশাসনিক যন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হলে জন সুরজ তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না।
প্রশান্ত কিশোর বাঁকিপুরের নির্বাচনী লড়াই প্রসঙ্গে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, পিকে-কে পরাজিত করার জন্য বিজেপিকে কতটা বিশাল শক্তি ও রসদ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, তা আজ সারা রাজ্যের মানুষ স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। এক অর্থে জন সুরজ একে তাদের একটি বড় রাজনৈতিক বিজয় হিসেবেই দেখছে। কারণ, বিজেপির যে সমস্ত হেভিওয়েট নেতা, বিধায়ক, সাংসদ ও মন্ত্রীরা এতদিন নিজেদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থাকতেন কিংবা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় পা রাখতেন না, তাঁরা আজ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার অনেক আগেই বাঁকিপুরের সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছাতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের জয় নয়, বরং বাঁকিপুরের সেই সমস্ত সচেতন ভোটারের জয়, যাঁরা নিজেদের কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের ক্রীতদাস মনে করেন না। যদি তাঁদের সামনে সঠিক ও বিকল্প কোনো মুখ থাকে, তবে তাঁরা তা অবশ্যই যাচাই করবেন এবং উপযুক্ত মনে করলে তবেই ভোট দেবেন।
বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের রূপরেখা স্পষ্ট করে প্রশান্ত কিশোর বলেন, আপনারা ৫০০ জন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকে প্রচারের ময়দানে নিয়ে আসতে পারেন, তাতে আমাদের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। লড়াই হবে এবং সেই লড়াইয়ের মুখোমুখি আমরা প্রস্তুত। কিন্তু আসল সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখনই, যখন শাসক পক্ষ কেবল প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির জন্য পুলিশ ও প্রশাসনকে নগ্নভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। আমরা অত্যন্ত ভালোভাবেই জানি যে যাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তাঁরা প্রায়শই ক্ষমতার জোরে অন্যদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। জন সুরজের যে সমস্ত কর্মী নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করে স্থানীয় হোটেলে অবস্থান করছেন, প্রতিদিন বিনা নোটিশে তাঁদের সেই হোটেলগুলিতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন, কেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা আকাশ হোটেলের মতো হাই-প্রোফাইল স্থানে বহালতবিয়তে থাকছেন? কেন সেই হোটেলগুলিতে কোনো পুলিশি তল্লাশি চালানো হচ্ছে না? তাঁদের থাকা-খাওয়ার বিলাসবহুল বিল কে পরিশোধ করছে, তা নিয়ে কেন কোনো সরকারি এজেন্সি প্রশ্ন তুলছে না? এত বিপুল সংখ্যক বিজেপি নেতা রাজ্যে এসে ভিড় জমাচ্ছেন, তাঁদের এই বিপুল ব্যয়ের উৎস কোথায়, তার জবাব সাধারণ মানুষের সামনে দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের দ্বিমুখী নীতি এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রশান্ত কিশোর বলেন, পাটনার জেলা প্রশাসক (ডিএম) কেবল একটি বিতর্কিত টুইট মুছে ফেললেই সমস্ত দায় এড়াতে পারবেন না; তাঁকে অবিলম্বে লিখিত নির্দেশ জারি করতে হবে যাতে জীবিকার সঙ্গে যুক্ত কোনো মহিলা কর্মী, আধা-সরকারি কর্মচারী বা সংশ্লিষ্ট কর্মীরা নির্বাচনী প্রচার বা রাজনৈতিক কার্যকলাপে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিতে না পারেন। গতকাল একটি সরকারি টুইট করে পাটনার ডিএম ঠিক সেই একই জঘন্য ও পক্ষপাতদুষ্ট কাজ করেছেন, যা এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরের বিধানসভা নির্বাচনেও করতে দেখা গিয়েছিল। ভোটার সচেতনতার নামে সরকারের অর্ধ-বেতনভোগী কর্মচারী এবং গ্রামের পর গ্রাম ছড়িয়ে থাকা জীবিকা দিদিদের ব্যবহার করে সাধারণ মহিলাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যে, যদি সাধারণ মানুষ এনডিএ বা বিজেপিকে ভোট না দেন, তবে তাঁদের নিয়মিত খাদ্যশস্য বরাদ্দ এবং বার্ধক্য বা বিধবা পেনশনের মতো সমস্ত জরুরি সরকারি সুযোগ-সুবিধা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এই ধরনের জঘন্য কার্যকলাপকে ‘চরম অসততা’ বলে অভিহিত করে পিকে জানান যে, গতকাল জীবিকা দিদিরা সারাদিন বিভিন্ন এলাকায় সভা করেছেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের ভয় দেখিয়েছেন। পাটনার জেলা প্রশাসকের বিতর্কিত টুইট প্রকাশের পরেই এই নির্দেশিকা কার্যকর করা হয়, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে জীবিকা দিদিদের যেন সচেতনতার অজুহাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলাদের মাঝে বসে বিজেপির পক্ষে ভোট আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমাদের দলীয় প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দু’বার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছে। আজ আমরা ফের নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি। কমিশনের বিভিন্ন আধিকারিকরা আমাদের কাছে বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে নির্বাচনী প্রচারের নিয়মানুযায়ী শুধুমাত্র সরকারি নিয়মিত কর্মচারীরাই এই ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন।
আধা-সরকারি তকমা প্রাপ্ত জীবিকা দিদিদের সরাসরি রাজনৈতিক নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া এবং তাঁদের দলীয় প্রচারের আনুষ্ঠানিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা মানেই বিহারের সাধারণ মানুষ, দেশের সংবিধান এবং বাঁকিপুরের ভোটারদের সঙ্গে চরম প্রতারণা করা। আজ আমরা নির্বাচন কমিশনের দফতরে গিয়ে তাঁদের হাতে শেষ ২৪ ঘণ্টার চরম আল্টিমেটাম তুলে দেব। যদি আগামীকালের মধ্যে জীবিকা দিদিদের এই রাজনৈতিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা না হয়, তবে জন সুরজের সমস্ত কর্মী-সমর্থক নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসতে বাধ্য হবেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আপনারা যে ধরনের কারচুপি ও অনৈতিক কাজ করেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি আমরা এবার কোনোভাবেই সহ্য করব না।
দেশজুড়ে তপ্ত হয়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের আকস্মিক পদত্যাগ প্রসঙ্গে প্রশান্ত কিশোর অত্যন্ত জোরালো সুরে বলেন, সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক বা সিজেপি-র মতো প্রতিনিধিরা যখনই বিহারের মাটিতে পা রাখবেন, তাঁদের সর্বান্তঃকরণে স্বাগত জানানো হবে। ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই পদত্যাগ পরিষ্কার প্রমাণ করে দিয়েছে যে এই দেশে শাসক দল যতই শক্তিশালী হোক না কেন, জনগণের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর ও প্রতিবাদকে কোনোমতেই দাবিয়ে রাখা যায় না। এটি তো কেবল একটি ঐতিহাসিক লড়াইয়ের শুরুমাত্র, এর শেষ এখানেই নয়। সরকারের সমস্ত অগণতান্ত্রিক আচরণ এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে যারা সাহসের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করতে চায়, জন সুরজ সবসময় তাঁদের পাশে রয়েছে। সোনম ওয়াংচুক আমার ব্যক্তিগত বন্ধু। লাদাখে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সময় যখন তাঁকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার করে যোধপুরে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল, তখনও আমি প্রকাশ্যে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। এটি কোনো নির্দিষ্ট দলের রাজনীতি নয়; আজ সাধারণ মানুষ নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছে যে যখন দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং জনতা জেগে ওঠে, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী স্বৈরাচারী শক্তিকেও শেষ পর্যন্ত হাঁটু গেড়ে মাথা নত করতে হয়।
পরিশেষে তিনি বলেন, আমরা খোদ রাজধানীতে দেখছি যে এই আন্দোলন কেবল একজন ব্যক্তি বা সোনম ওয়াংচুককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে ফেটে পড়া হাজার হাজার তরুণ-তরুণী কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পতাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় নামেননি। দেশের ক্রমবর্ধমান প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি, ব্যাপক বেকারত্ব এবং ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থার চরম রূপ দেখে তাঁরা আজ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। তাঁরা কোনো একক নেতাকে অন্ধের মতো অনুসরণ করছেন না, বরং তাঁরা নিজেদের ও দেশের আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল ও উন্নত ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় রাজপথে নেমেছেন। যে বিজেপি নিজেদের বিশ্বের বৃহত্তম ও অপরাজেয় রাজনৈতিক দল বলে বুক বাজিয়ে দাবি করত, তারা মাত্র তিন দিনের ছাত্র আন্দোলনের তীব্র চাপে নিজেদের সমস্ত অহংকার হারিয়ে ফেলেছে। দেশের শিক্ষামন্ত্রীকে বাধ্য হয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হয়েছে। আগামী দিনের পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে, কারণ এটি কেবল একটি ঝড়ের সূচনা মাত্র; এই প্রতিবাদের জোয়ার সহজে থামবে না। এই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে রাজ্য সভাপতি মনোজ ভারতী সহ দলের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন।