সাবধান! সাধারণ মশার কামড়েই হতে পারে মারাত্মক মস্তিষ্কের সংক্রমণ, বর্ষায় কোন ঘাতক রোগ নিয়ে সতর্ক করলেন চিকিৎসকরা?

বর্ষাকাল মানেই চারদিকে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া আর চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের উপদ্রব। কিন্তু এর বাইরেও এমন একটি ভয়ংকর ভাইরাস রয়েছে, যা মশার কামড়ের মাধ্যমেই সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগটির নাম জাপানিজ এনসেফালাইটিস। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই রোগ যেমন প্রাণঘাতী হতে পারে, তেমনই সেরে ওঠার পরেও রোগীর শরীরে দীর্ঘদিন স্নায়ুর মারাত্মক সমস্যা থেকে যেতে পারে।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, জাপানিজ এনসেফালাইটিস একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ। কিউলেক্স প্রজাতির সংক্রমিত মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এই ভাইরাস ছড়ায়। তবে সব কিউলেক্স মশার কামড়ে এই রোগ হয় না। শুধুমাত্র যে সমস্ত মশার শরীরে এই নির্দিষ্ট ভাইরাসটি বহন করার ক্ষমতা থাকে, তারাই এই সংক্রমণ ছড়ায়। শরীরে ভাইরাস প্রবেশের পর অধিকাংশ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তা রুখে দিতে পারলেও, অনেকের ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের পর রক্তের মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস তৈরি হয়। এই প্রদাহের জেরে মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে, যার ফলে রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অত্যন্ত দ্রুত অবনতি ঘটে।

এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেকটা সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতোই মনে হতে পারে। যেমন— হঠাত্‍ উচ্চমাত্রায় জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, বমি ভাব, শরীর অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে যাওয়া, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং আলো সহ্য করতে না পারা। তবে সংক্রমণ গুরুতর আকার ধারণ করলে খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ, বিভ্রান্তি, কথা বলতে বা হাঁটতে সমস্যা, অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া এবং রোগীর অচেতন বা কোমায় চলে যাওয়ার মতো মারাত্মক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এমন লক্ষণ প্রকাশ পেলে এক মুহূর্তও দেরি না করে রোগীকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত।

শিশু, বয়স্ক এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম, তাঁরা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা, ধানখেতের আশপাশ বা যেখানে শূকর পালন করা হয়, সেখানে এই ভাইরাসের প্রকোপ ও সংক্রমণের সম্ভাবনা বহুগুণ বেশি থাকে। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ সরাসরি একজন মানুষের থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়ায় না। সাধারণত শূকর এবং কিছু জলচর পাখি এই ভাইরাসের মূল বাহক হিসেবে কাজ করে। সংক্রমিত প্রাণীকে মশা কামড়ানোর পর সেই মশা মানুষকে কামড়ালে তবেই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে।

জাপানিজ এনসেফালাইটিসের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা করা হয়। জ্বর নিয়ন্ত্রণ, খিঁচুনি বন্ধ করা, শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা এবং প্রয়োজনে আইসিইউ-তে রেখে চিকিৎসা চালাতে হয়। বর্ষাকালে মশার কামড় এড়ানোই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাড়ির আশপাশে জল জমতে না দেওয়া, রাতে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, ফুলহাতা জামাকাপড় পরা এবং মশা তাড়ানোর রিপেলেন্ট ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি, যেসব এলাকায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি, সেখানে সরকারি নিয়ম মেনে সময়মতো টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বর্ষার সাধারণ জ্বরকেও হালকাভাবে না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই জীবন বাঁচাতে পারে।