প্রধান বা চেয়ারম্যানদের হাতে আর রইল না ক্ষমতা! জন্ম-মৃত্যুর সার্টিফিকেট নিয়ে রাজ্য সরকারের এই নতুন নিয়মে শোরগোল

রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় চরম স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং দীর্ঘদিনের দুর্নীতির জাল চিরতরে ছিন্ন করতে এক অত্যন্ত কঠোর ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে নতুন রাজ্য সরকার। এখন থেকে পঞ্চায়েত প্রধান, পুরসভার চেয়ারম্যান কিংবা পুরনিগমের মেয়রদের মতো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাত থেকে জন্ম এবং মৃত্যুর শংসাপত্র বা বার্থ-ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করার সমস্ত ক্ষমতা পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হলো। এর পরিবর্তে আগামী দিনে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে ন্যস্ত করা হচ্ছে শুধুমাত্র স্থায়ী সরকারি আধিকারিকদের হাতে। বৃহস্পতিবার একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি সাংবাদিক বৈঠকে অংশ নিয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন এবং বর্তমান প্রশাসনের এই গোটা প্রক্রিয়াটিকে প্রশাসনিক ‘শুদ্ধিকরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের গ্রামীণ স্তরে পঞ্চায়েত প্রধান এবং শহরাঞ্চলে পুরসভার চেয়ারম্যান বা মেয়ররাই এই জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্র প্রদান করে আসছিলেন। তবে বিগত বেশ কিছুদিন ধরে এই ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহার করে দেদার ভুয়ো ও জাল শংসাপত্র বিলি করার একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রশাসনিক মহলের নজরে আসছিল। এই অবৈধ জাল শংসাপত্রগুলির অপব্যবহার করেই মূলত ভোটার তালিকায় ভুয়ো নাম তোলা থেকে শুরু করে অত্যন্ত সংবেদনশীল আধার কার্ড তৈরিতে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও আইনি জালিয়াতি সংঘটিত হতো। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের সদ্যসমাপ্ত ভোটার তালিকা বিশেষ সংশোধনের কাজ চলার সময়ও প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে লক্ষাধিক ভুয়ো শংসাপত্রের হদিশ মিলেছিল। এই সমস্ত রমরমা বেনিয়ম ও জালিয়াতি পাকাপাকিভাবে রুখতেই এবার এই কড়া অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন।

ইতিমধ্যেই রাজ্যের সমস্ত পুরসভা এবং পঞ্চায়েত অফিসগুলি থেকে জন্ম ও মৃত্যুর সমস্ত পুরনো রেজিস্টার বাজেয়াপ্ত করে সেগুলি স্ক্যান করার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয়ে গেছে। এই বিষয়ে মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, ‘‘আমরা রাজ্যের প্রতিটি মানুষকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরানোর স্বার্থেই এই কঠোর পদক্ষেপ করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা হবে না। যাঁদের কাছে পূর্বে সম্পূর্ণ নিয়মানুযায়ী সঠিক উপায়ে বার্থ সার্টিফিকেট বা শংসাপত্র পৌঁছে গেছে, তাঁদের কোনো ধরনের শঙ্কা বা ভয়ের কোনো কারণ নেই।’’ তবে একই সঙ্গে সমস্ত জালিয়াত চক্র ও অপরাধীদের অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়ে তিনি হুঙ্কার ছেড়ে বলেছেন যে, ‘‘যাঁরা এই পুরো জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থেকে গন্ডগোল পাকিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অত্যন্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’’

নতুন ও সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে শুধুমাত্র সরকারিভাবে স্থায়ী কর্মচারীরাই এই গুরুত্বপূর্ণ শংসাপত্র ইস্যু করার একচ্ছত্র অধিকারী হবেন। সরকারি কর্মীদের কাজের দায়বদ্ধতার দিকটিও বিশেষভাবে তুলে ধরে মুখ্যসচিব জানান যে, এই অতি সংবেদনশীল ক্ষেত্রে যদি কোনো কর্তব্যে গাফিলতি বা দুর্নীতি ধরা পড়ে, তবে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে ভুয়ো শংসাপত্র তৈরি ও বিতরণের নেপথ্যে বহু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও চক্রী সরাসরি জড়িত ছিল বলেও তিনি জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সাধারণ নাগরিকদের যাতে কোনো ধরনের চরম হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, চালু থাকা সমস্ত রেজিস্টার দ্রুত ডিজিটালি স্ক্যান করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফেরত দেওয়া হবে। তবে সরকারের কাছে সমস্ত পুরনো আইনি নথি সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত থাকবে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো প্রয়োজনে সেই ডিজিটাল নথি দিয়েই শংসাপত্র যাচাই করা হবে। এই জালিয়াতি চিরতরে বন্ধ করতে রাজ্য সরকার ভারতের কেন্দ্রীয় জন্ম-মৃত্যু নিয়ন্ত্রণকারী বা সিআরএস (CRS) পোর্টালের সঙ্গে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে সংযুক্ত করছে। যাঁদের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো শক্তপোক্ত প্রামাণ্য নথি বা তথ্য থাকবে না, তাঁদের ক্ষেত্রে খোদ জেলাশাসক নিজে কিংবা তাঁর বিশ্বস্ত প্রতিনিধি সরাসরি সরেজমিনে তদন্ত করে শংসাপত্র মঞ্জুর করবেন। প্রশাসনের এই স্বচ্ছ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে মুখ্যসচিবের সুদৃঢ় মন্তব্য, ‘‘আমরা অত্যন্ত সংবেদনশীল মন নিয়ে মানবিকভাবে এগোব, সম্পূর্ণ দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করব এবং সর্বোচ্চ নৈতিকতা বজায় রেখেই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করব।’’