সাধারণ মানুষের জন্য নয় এই ইনভেস্টমেন্ট! ২০ থেকে ৩০ শতাংশ রিটার্নের লোভে নামছেন কারা?

ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডি-তে বর্তমানে সাধারণ ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে ভালো মানের মিউচুয়াল ফান্ড সাধারণত ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বার্ষিক রিটার্ন দিয়ে থাকে। তবে এর বাইরেও মার্কেটে এমন কিছু অতি ধনী মানুষ রয়েছেন যারা বার্ষিক ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত চোখ ধাঁধানো রিটার্নের কথা বলে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তারা কি সাধারণ কোনো রাস্তায় হাঁটছেন? না, তারা মূলত ঝুঁকিপূর্ণ অথচ লাভজনক অল্টারনেট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বা এআইএফ (AIF)-এর দিকে পা বাড়াচ্ছেন।
এই এআইএফ আসলে কী? নামটা শুনতে কিছুটা জটিল মনে হলেও এর মূল ধারণাটি বেশ সহজ। এটি মূলত একটি বিশেষ প্রাইভেট ফান্ড, যেখানে কয়েকজন বড় ও বিত্তশালী বিনিয়োগকারী একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে অর্থ জমা করেন। সেই বিশাল পরিমাণ অর্থ সেবি (SEBI)-র অনুমোদনপ্রাপ্ত একটি দক্ষ প্রফেশনাল টিম এমন সব লাভজনক জায়গায় বিনিয়োগ করে, যেখানে সাধারণ মিউচুয়াল ফান্ড চাইলেও হাত দিতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো সম্ভাবনাময় নতুন স্টার্টআপ, বড় কোনো প্রাইভেট কোম্পানি, বড় রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট কিংবা বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে এই টাকা খাটানো হয়। মিউচুয়াল ফান্ডের মতো এখানে অত কঠোর বা কড়া নিয়মকানুন থাকে না, তাই ফান্ড ম্যানেজার নিজের ইচ্ছেমতো অনেক বেশি ঝুঁকি নিতে পারেন। আর আর্থিক খাতের দুনিয়ায় ঝুঁকি বেশি মানেই লাভের সম্ভাবনাও বহুগুণ বেশি।
সেবি (SEBI)-এর পক্ষ থেকে এআইএফ-কে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ক্যাটাগরির এআইএফগুলো সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগে, কারণ এরা স্টার্টআপ, ছোট কোম্পানি বা বিভিন্ন সামাজিক প্রজেক্টে অর্থায়ন করে থাকে এবং সরকারও এদের বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা প্রদান করে। দ্বিতীয় ক্যাটাগরির ফান্ডটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, যা সরাসরি প্রাইভেট কোম্পানিতে টাকা লাগায় বা বড় বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলোকে মোটা অঙ্কের ঋণ দেয়। আর তৃতীয় ক্যাটাগরিটি হলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে শেয়ার বাজারে শর্ট সেল করা বা ডেরিভেটিভস নিয়ে বড় বাজি ধরা হয়। এখানে যেমন খুব দ্রুত বিশাল অঙ্কের লাভ হতে পারে, তেমনই চোখের পলকে বড় ধরনের লোকসান হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।
তবে চাইলেই যে কেউ এই এআইএফ-এ বিনিয়োগ করতে পারবেন, বিষয়টি এমন নয়। আর এটাই হলো এর সবচেয়ে বড় বাধা বা সীমাবদ্ধতা। সেবির কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, এআইএফ-এ বিনিয়োগ করার জন্য ন্যূনতম ১ কোটি টাকা থাকতে হবে। হ্যাঁ, একদম ঠিক শুনেছেন, ন্যূনতম ১ কোটি টাকা! তাই এটি কোনোভাবেই সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য তৈরি করা হয়নি। মূলত যাদের হাতে অতিরিক্ত প্রচুর অর্থ রয়েছে, যাদের ফিন্যান্সিয়াল দুনিয়ায় এইচএনআই (HNI) বলা হয়, কিংবা বড় বড় কর্পোরেট সংস্থাই এখানে নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। এর মূল কারণ হলো এখানে বিনিয়োগ করা অর্থ একটানা ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য সম্পূর্ণ লক-ইন বা আটকে যায়, যার ফলে মাঝপথে চাইলেও সেই টাকা তুলে নেওয়া সম্ভব হয় না, অর্থাৎ এর লিকুইডিটি বা তারল্য খুবই কম।
তাহলে এআইএফ-এ বিনিয়োগ করে আদতে লাভ কী? যদি একজন অভিজ্ঞ ফান্ড ম্যানেজার সঠিক ও সম্ভাবনাময় জায়গাটি বেছে নিতে পারেন, তবে মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই আপনার মূল বিনিয়োগের টাকা দ্বিগুণ বা এমনকি তিনগুণ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। কারণ একটি ছোট স্টার্টআপ যখন সফল হয়ে বড় কোম্পানিতে রূপ নেয়, তখন তার থেকে প্রাপ্ত রিটার্ন আকাশছোঁয়া হতে পারে। কিন্তু এর ঠিক উল্টো দিকটিও আমাদের মাথায় রাখা দরকার। যে সমস্ত কোম্পানিতে অর্থ খাটানো হয়েছে, তা যদি কোনো কারণে ব্যর্থ হয়, তবে আপনার পুরো টাকাই সম্পূর্ণ জলে যেতে পারে। এছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডের মতো এখানে প্রতিদিন বা নিয়মিতভাবে আপনার জমানো টাকার হিসাব বা নেট অ্যাসেট ভ্যালু দেখতে পাবেন না, কারণ এখানে স্বচ্ছতা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এআইএফ-এর পুরো কনসেপ্টটিই হলো হাই রিস্ক এবং হাই রিটার্ন বা উচ্চ ঝুঁকি ও উচ্চ লাভের সমীকরণ। যার কাছে অন্তত ১ কোটি টাকা অলসভাবে পড়ে আছে এবং যিনি সেই বিশাল অঙ্কের টাকা আগামী ১০ বছরের জন্য পুরোপুরি ভুলে থাকতে পারবেন, শুধুমাত্র তারাই এই বিনিয়োগের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে পারেন। তবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এখনো এফডি, পিপিএফ এবং মিউচুয়াল ফান্ডই সবচেয়ে নিরাপদ, বিশ্বস্ত এবং বুদ্ধিমানের বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।