ভারতের শ্রম কাঠামোয় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কেন্দ্রীয় সরকার ২৯টি পুরনো শ্রম আইনকে একত্র করে চারটি নতুন ‘লেবার কোড’ বা শ্রম কোড কার্যকর করার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং শিল্প সম্পর্কের মতো বিষয়গুলোতে আনা এই আমূল পরিবর্তন দেশের কোটি কোটি চাকুরিজীবীর জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
নতুন এই নিয়মের ফলে বেতন কাঠামো থেকে শুরু করে ছুটির তালিকা—সবই বদলে যেতে চলেছে। একনজরে দেখে নিন নতুন শ্রম আইনের প্রধান দিকগুলি:
কর্মঘণ্টা ও ৩ দিনের ছুটি: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, দৈনিক কাজের সর্বোচ্চ সময় বাড়িয়ে ১২ ঘণ্টা করা হয়েছে। তবে সাপ্তাহিক মোট কর্মঘণ্টা ৪৮ ঘণ্টার বেশি হবে না। এর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে তাদের কর্মীদের সপ্তাহে চার দিন কাজ এবং তিন দিন ছুটির সুবিধা দিতে পারে। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর নির্ভর করবে।
বেতন কাঠামোয় বড় রদবদল: চাকুরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে বড় খবর হলো বেতন কাঠামোর পরিবর্তন। এখন থেকে মোট বেতনের (CTC) অন্তত ৫০ শতাংশ হতে হবে ‘বেসিক স্যালারি’ বা মূল বেতন।
সুবিধা: বেসিক বেতন বাড়লে পিএফ (PF) এবং গ্র্যাচুইটির পরিমাণ অনেকটা বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, অবসরের সময় কর্মীরা অনেক বেশি টাকা হাতে পাবেন।
অসুবিধা: বেসিক বেতন বাড়ার ফলে পিএফ বাবদ বেতন থেকে বেশি টাকা কাটবে, যার ফলে মাসিক হাতে পাওয়া নগদ বেতন (Take Home Salary) কিছুটা কমে যেতে পারে।
গ্র্যাচুইটি ও ওভারটাইমে স্বস্তি: এখন আর গ্র্যাচুইটির জন্য ৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে না। ‘ফিক্সড টার্ম’ বা নির্দিষ্ট মেয়াদের কর্মচারীরা মাত্র এক বছর কাজ করলেই গ্র্যাচুইটির সুবিধা পাবেন। এছাড়া, নির্ধারিত সময়ের বাইরে অতিরিক্ত কাজ করলে দ্বিগুণ হারে ওভারটাইম মজুরি দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নারী নিরাপত্তা ও সমানাধিকার: নতুন আইনে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ‘সমান কাজের জন্য সমান বেতন’ নিশ্চিত করা হয়েছে। মহিলারা এখন থেকে সব ধরনের কাজেই অংশ নিতে পারবেন। এমনকি রাতে কাজ করার ক্ষেত্রেও অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে সে ক্ষেত্রে কোম্পানিকে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
নিরাপত্তা ও ছাঁটাই সংক্রান্ত কড়াকড়ি: বড় সংস্থাগুলোতে ক্যান্টিন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি, হুটহাট কর্মী ছাঁটাই করা যাবে না। কর্মী কমাতে গেলে নির্দিষ্ট নোটিশ এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের আগে সরকারি অনুমতি নেওয়াও এখন থেকে বাধ্যতামূলক।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন শ্রম কোড শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা বাড়ালেও কর্পোরেট সংস্থাগুলোর খরচ কিছুটা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা নেবে।





