দিল্লির জনপ্রিয় মজনু কা টিলা এলাকায় এক মর্মান্তিক ঘটনায় ২২ বছর বয়সী প্রেমিকা সোনাল এবং মাত্র ছয় মাসের এক দুধের শিশুকে ধারালো সার্জিকাল ব্লেড দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন যুবক নিখিল। এই লোমহর্ষক ঘটনার পর অভিযুক্ত নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন এবং ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। বুধবার ব্যাপক তল্লাশি অভিযানের পর উত্তরাখণ্ডের হালদ্বানি থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সম্পর্কের জটিল জাল ও এক নির্মম পরিণতি
পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে এক জটিল সম্পর্কের কাহিনী, যা শেষ হয়েছে এই ভয়াবহ জোড়া খুনে। নিহত সোনাল ঘটনার কয়েকদিন আগে থেকেই মজনু কা টিলায় একটি বাড়িতে থাকছিলেন। বুধবার দুপুর ১টা নাগাদ সেই বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে উত্তরাখণ্ডের হালদ্বানির বাসিন্দা নিখিল তার ওপর আক্রমণ চালায়। প্রথমে সোনালকে খুন করে, এরপর ঘরে থাকা ছয় মাসের শিশুটির গলা কেটে হত্যা করে সে।
২০২৩ সালে হালদ্বানির একটি অনুষ্ঠানে সোনালের সঙ্গে নিখিলের আলাপ হয়, যা থেকে তাদের প্রেম এবং লিভ-ইন সম্পর্ক শুরু হয়। সে বছরের শেষের দিকে সোনাল অন্তঃসত্ত্বা হন। আর্থিক সংকট এবং অবিবাহিত হওয়ায় তারা প্রথমে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিলেও, পরে পরিকল্পনা করেন যে, বাচ্চা জন্ম দিয়ে তাকে বিক্রি করে দেবেন।
২০২৪ সালের শুরুতে সন্তানের জন্ম হয় এবং অভিযোগ, সেই সন্তানকে ২ লক্ষ টাকা দিয়ে আলমোড়ার এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন তারা। সেই টাকা নিয়েই তারা দিল্লিতে এসে প্রথমে ওয়াজিরাবাদ এবং পরে মজনু কা টিলায় থাকতে শুরু করেন। এই সময় থেকেই তাদের সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।
ত্রিকোণ প্রেম ও গর্ভপাত: আক্রোশের কারণ?
সোনালের সঙ্গে মজনু কা টিলার বাসিন্দা রেশমির আলাপ হয় এবং সোনাল রেশমির বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেন। পরবর্তীতে প্রেমিক নিখিলের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় সোনাল প্রায়শই রেশমির বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। রেশমির স্বামী দুর্গেশের সঙ্গে সোনালের সম্পর্ক নিয়ে নিখিলের সন্দেহ ঘনীভূত হতে থাকে। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট দেখে সোনালকে তিনি একাধিকবার প্রশ্নও করেন।
এই সময় সোনাল আবারও অন্তঃসত্ত্বা হন। কিন্তু এবার নিখিল সেই সন্তানকে রাখতে চেয়েছিলেন এবং সংসার পাতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সোনাল গোপনে গর্ভপাত করিয়ে ফেলেন। নিখিলের সন্দেহ, দুর্গেশই সোনালকে এই সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেছিলেন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই তাকে হারানোর ক্ষোভে নিখিল ফুঁসছিলেন।
ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর আগে, ঘটনার প্রায় ২০-২৫ দিন আগে সোনাল পুরোপুরি রেশমির বাড়িতে চলে যান এবং সেখানেই থাকা শুরু করেন। নিখিল তখনও সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তা আর কাজে আসেনি।
খুনের দিন ও পলায়ন
বুধবার দুপুরে রেশমি ও দুর্গেশ তাদের পাঁচ বছরের বড় মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে যান। বাড়িতে ছিলেন সোনাল এবং রেশমির ছয় মাসের মেয়ে। এই সুযোগে রেশমির বাড়িতে ঢোকেন নিখিল। তার হাতে ছিল একটি সার্জিকাল ব্লেড। পুলিশ জানিয়েছে, দু’জনের মধ্যে প্রথমে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়। এরপর নিখিল সোনালের মুখ বেঁধে গলা কেটে খুন করেন।
যেহেতু নিখিলের সন্দেহ ছিল যে দুর্গেশের প্ররোচনায় সোনাল গর্ভপাত করেছেন, তাই আক্রোশের জেরে সে ছয় মাসের শিশুটিকেও হত্যা করে। শিশুটির কান্নার আওয়াজ যাতে বাইরে না আসে, সেজন্য প্রথমে টেপ দিয়ে তার মুখ ভালো করে বেঁধে তারপর গলা কেটে দেওয়া হয়। খুনের পর নিখিল নিজের ফোন ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়, সম্ভবত লোকেশন ট্র্যাক এড়ানোর জন্য।
স্কুল থেকে ফিরে রেশমি ও দুর্গেশ রক্তে ভেসে থাকা ঘর দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান এবং সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশে খবর দেন।
গ্রেফতার ও তদন্তের অগ্রগতি
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুন করে নিখিল প্রথমে নিজের ভাড়া বাড়িতে ফিরেছিলেন এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। এরপর পুরনো দিল্লি স্টেশন হয়ে বেরেলি এবং সেখান থেকে হালদ্বানি পৌঁছে তার বোনের এক পরিচিতের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পুলিশের দল পৌঁছনোর আগেই সে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তবে, রাতভর পালিয়ে বেড়ানোর পর বৃহস্পতিবার সকালে সে আবারও সেই বাড়িতে ফিরে এলে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে নিখিল খুনের দায় স্বীকার করেছে। এই ঘটনায় দুর্গেশ সত্যিই জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সমগ্র বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে। এই নৃশংস ঘটনাটি দিল্লিতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং সম্পর্কের জটিলতা যে কীভাবে এমন ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, তার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।





