সংসদে বর্ষাকালীন অধিবেশনের শুরুতেই সংঘাত, ‘অপারেশন সিঁদুর’ জয়োৎসব বনাম বিরোধীদের আলোচনার দাবি

আজ থেকে শুরু হওয়া সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল দেশের আইনসভা। একদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর শতভাগ সাফল্য উদযাপন করে ভারতীয় সামরিক শক্তির জয় ঘোষণা করলেন, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলি, বিশেষ করে কংগ্রেস ও ‘ইন্ডিয়া’ জোট, পহেলগাঁও হামলা ও বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধন সহ আটটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার দাবিতে সরব হয়েছে। এই দুই বিপরীত মেরুর অবস্থানে সংসদীয় কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা।
প্রধানমন্ত্রীর ‘বিজয় উৎসব’ ও সামরিক শক্তির জয়গান:
অধিবেশন শুরুর আগে তাঁর প্রথাগত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বর্ষাকালীন অধিবেশনকে ‘বিজয় উৎসব’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “সমগ্র বিশ্ব ভারতের সামরিক শক্তির শক্তি দেখেছে। অপারেশন সিঁদুর ভারতীয় সেনাবাহিনীর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তা ১০০ শতাংশ অর্জন করা হয়েছে।” প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আওতায় মাত্র ২২ মিনিটের মধ্যে সন্ত্রাসবাদীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ সামরিক শক্তির এই নতুন রূপ বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত প্রশংসিত হচ্ছে এবং বিদেশী রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে দেখা করলেই ভারতের তৈরি অস্ত্রের প্রতি তাঁদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক ও বিরোধীদের চাপ:
অধিবেশন শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহ, জে পি নাড্ডা, রাজনাথ সিং, শিবরাজ সিং চৌহান, নির্মলা সীতারমণ, কিরেন রিজিজু এবং অর্জুন রাম মেঘওয়াল সহ সিনিয়র মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সূত্র অনুযায়ী, এই বৈঠকে চলমান বর্ষাকালীন অধিবেশনের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে যে, বিজনেস অ্যাডভাইসরি কমিটি (BAC)-তে বিরোধীরা আলোচনা এবং সংসদে তাঁর (প্রধানমন্ত্রীর) বক্তব্য রাখার বিষয়ে জোর দিয়েছে। বিশেষ করে “অপারেশন সিঁদুর” ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য রাখার দাবিতে বিরোধীদের হট্টগোল সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে।
বিরোধীদের আটটি দাবি ও রাহুল-প্রিয়াঙ্কার ক্ষোভ:
তবে, সরকারের এই ‘বিজয় উৎসব’ উদযাপনের বিপরীতে বিরোধীরা ভিন্ন সুর তুলেছে। কংগ্রেস এবং ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্যান্য দলগুলি বর্ষাকালীন অধিবেশনে আলোচনার জন্য আটটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে পহেলগাঁও হামলা এবং বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন অন্যতম। বিরোধী সদস্যরা এই বিষয়ে স্থগিতাদেশের নোটিশ দিয়েছিলেন, যা অবশ্য গৃহীত হয়নি।
নিজস্ব দাবির সমর্থনে লোকসভায় বিরোধীরা লাগাতার স্লোগান দিতে থাকে, যার জেরে সংসদ প্রথমে দুপুর ১২টা এবং পরে দুপুর ২টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “… প্রতিরক্ষা মন্ত্রীকে সংসদে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমাকে সহ বিরোধী সদস্যদের, যিনি বিরোধী দলনেতা, কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়নি… এটি একটি নতুন পদ্ধতি… রীতি অনুযায়ী, যদি সরকার পক্ষের লোকেরা কথা বলতে পারে, তাহলে আমাদেরও কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত।” কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রা সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর মন্তব্যের উল্লেখ করে বলেন যে, সরকার অপারেশন সিন্দুর নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, “যদি তারা (সরকার) আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাহলে তাদের বিরোধী দলনেতাকে কথা বলতে দেওয়া উচিত। তিনি কথা বলার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন, তাই তাকে কথা বলার অনুমতি দেওয়া উচিত।”
সংসদের প্রথম দিনেই সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে এই তীব্র সংঘাত আগামী দিনগুলিতে বর্ষাকালীন অধিবেশনের গতিপ্রকৃতি কেমন হয়, সেদিকেই এখন সবার নজর।