শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি! কানাডার দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র, আকাশ ঢেকেছে ঘন অন্ধকারে

কানাডার দাবানলের রেশ এখন আর কেবল বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই, এর বিষাক্ত প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সীমান্ত পেরিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। বুধবার সকাল নাগাদ বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ বায়ুমানের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে টরন্টো। আকাশজুড়ে ঘন ধোঁয়া আর কুয়াশার আস্তরণে ঢেকেছে টরন্টোসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই যে, টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় এবং নাথান ফিলিপস স্কোয়ারে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের ওয়াচ পার্টিসহ একাধিক বড় ইভেন্ট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কানাডীয় আবহাওয়াবিদ ব্রায়ান ওসিয়াক জানিয়েছেন, বায়ুদূষণের মাত্রা বর্তমানে চরম পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী শুক্রবার পর্যন্ত এই পরিস্থিতির উন্নতির তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিও এবং ছবিতে দেখা যাচ্ছে, টরন্টোর আকাশ ধোঁয়ার কারণে কমলা বর্ণ ধারণ করেছে, যার প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরেও অনুভূত হচ্ছে। ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগামী দিনগুলোতে উত্তর-পূর্ব এবং মধ্য-আটলান্টিকের বড় শহরগুলোতেও এই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কানাডার আন্তঃসংস্থা বন অগ্নিকাণ্ড কেন্দ্রের তথ্যমতে, দেশটিতে বর্তমানে ৮৩৬টিরও বেশি দাবানল জ্বলছে, যার মধ্যে অন্তত ১৯৪টি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নর্থওয়েস্ট টেরিটোরিজ, অন্টারিও এবং কুইবেকের মতো অঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। চলতি গ্রীষ্মে কানাডায় প্রায় ৩,৫০০টি দাবানলে ৪৮ লক্ষ একরেরও বেশি বনভূমি ভস্মীভূত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, হাজার হাজার মাইল দূরের এই ধোঁয়া কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাচ্ছে? এর পেছনে কাজ করছে একটি অনন্য আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া। দাবানলের তীব্র তাপে ধোঁয়া ও গরম বাতাস বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচুতে উঠে যায়। সেখানে উচ্চগতির ‘জেট স্ট্রিম’ বাতাস সেই ধোঁয়াকে শত শত মাইল দূরে নিয়ে যায়। ফক্স ওয়েদার ফোরকাস্ট সেন্টারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলে সৃষ্ট ‘তাপীয় গম্বুজ’ (Heat Dome) এবং বাতাসের দিক পরিবর্তনের ফলে ধোঁয়ার এই ঘন স্তর সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের লোয়ার ৪৮টি অঙ্গরাজ্যে প্রবেশ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধোঁয়া যখন ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি নেমে আসে, তখনই সবচেয়ে বেশি বিপদ ঘটে। বাতাসের এই ধোঁয়ার সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হলো পিএম২.৫ বা অতিসূক্ষ্ম কণা। এগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে সহজেই ফুসফুসের গভীরে এবং রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। দীর্ঘক্ষণ এই বাতাসে শ্বাস নিলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট এবং গলার জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নাগরিকদের জন্য কড়া নির্দেশিকা জারি করেছেন। বাইরে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়াতে, ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে এবং উচ্চমানের ফিল্টারযুক্ত এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দাবানলের এই ভয়াবহতা কি উত্তর আমেরিকার ভবিষ্যতের নতুন স্বাভাবিকতা হতে চলেছে? এই প্রশ্নই এখন পরিবেশবিদদের মুখে।