শুভেন্দুর হুঁশিয়ারি ফুৎকারে উড়িয়ে যাদবপুরে বামেদের মেগা বুক স্টল! উদ্বোধনে সব্যসাচী-বিমান!

বুক স্টল সংক্রান্ত রাজ্যের রাজনৈতিক তরজা ও হুংকারকে পুরোপুরি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবশেষে তৃতীয়ার দিনই জাঁকজমকপূর্ণভাবে প্রগতিশীল বই বিপণির উদ্বোধন করল সিপিএম। তাও আবার খাস যাদবপুরের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল চত্বরে। উদ্বোধনী এই জমকালো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু, প্রবীণ ও জনপ্রিয় অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের হেভিওয়েট নেতা কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে অনুষ্ঠানে বিমান বসু সাফ জানিয়েছেন যে, মানুষের উপর জোর করে কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস বা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার বিন্দুমাত্র অধিকার কারও নেই।
মঙ্গলবার যাদবপুর ১ ও ২ এরিয়া কমিটির উদ্যোগে ৮বি বাসস্ট্যান্ডের ঠিক পাশেই এই মার্কসীয় ও প্রগতিশীল বই বিক্রয় কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ সেনগুপ্ত। এদিনের এই জমায়েত থেকে বই পড়া, বই কেনা এবং নতুন প্রজন্মকে বই উপহার দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানান বর্ষীয়ান বাম নেতা বিমান বসু। বর্তমান সরকারের নীতি ও সাংস্কৃতিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে তিনি আরও বলেন, “সমাজ ও সমাজব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি নিখুঁতভাবে বুঝতে হলে পড়াশোনার বিকল্প নেই। শাসনব্যবষ্টাকে উপলব্ধি করতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হলে জ্ঞান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী—ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের এক অপূর্ব বৈচিত্র্য রয়েছে। এই বহুত্ববাদকে অস্বীকার করার কোনো অর্থ হয় না।” সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং যন্তর মন্তরের মতো জায়গায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাধা দেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে একের পর এক হামলার প্রসঙ্গ তুলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী। সমাজের সঙ্গে শিক্ষার দূরত্ব তৈরির একটি সুদূরপ্রসারী চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করে তিনি জানান যে, শিক্ষার প্রসার রুখতেই এই ধরনের আক্রমণ চালানো হচ্ছে। সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির বিখ্যাত সংলাপের সঙ্গে মিল রেখেই সব্যসাচী জোরালো কণ্ঠে বলেন, “যারা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে আর তত কম মানে!” শিক্ষিত সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, যাঁদের পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে, তাঁদের আরও বেশি করে পড়া উচিত এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের পড়াশোনায় সর্বতোভাবে সাহায্য করা উচিত।
উল্লেখ্য, এই বইয়ের স্টলটি কেবল মার্কসীয় ও প্রগতিশীল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। এখানে বিশেষ জায়গা পেয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাস ও কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধ্রুপদী সাহিত্য। এছাড়াও রয়েছে সমৃদ্ধ ভ্রমণকাহিনি, শিশু সাহিত্য এবং ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ক নানান দুর্লভ বই। নাৎসি জার্মানি, মনুসংহিতা, উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও ভারতীয় ফ্যাসিবাদ সংক্রান্ত প্রামাণ্য বইয়ের পাশাপাশি মার্কসবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বামী বিবেকানন্দ, দেশভাগের ট্র্যাজেডি এবং এনআরসি-র মতো অতি সংবেদনশীল বিষয়ের ওপর লেখা বইও রাখা হয়েছে। প্রায় ৩৫টি নামী প্রকাশনা সংস্থার বই নিয়ে সুসজ্জিত এই বিশেষ বিক্রয় কেন্দ্রটি আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকবে। উদ্বোধনী দিনে সুব্রত দাশগুপ্তের লেখা ‘চক্রব্যূহ’ বইটি উন্মোচন করেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু।