শুভকাজে বেরোলেই সামনে পড়ে বিড়াল? হাজার বছরের পুরনো এই কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের ইতিহাস জানলে চোখ কপালে উঠবে

অফিস, স্কুল, পরীক্ষা কিংবা জরুরি কোনো কাজে কোথাও যাওয়ার সময় বাড়ি থেকে বেরোনোর মুহূর্তটি সবসময়ই অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে কাটে। নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাওয়ার ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ যদি চোখের সামনে দিয়ে এক লাফে রাস্তা পার হয়ে যায় একটা সাধারণ বিড়াল, তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ব্যস, আর যায় কোথায়! যত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজই আপনার সামনে থাকুক না কেন, আপনার মনের অজান্তেই আপনার পা দুটো যেন এক নিমেষে থমকে দাঁড়ায়। আপনি সঙ্গে সঙ্গে বাধ্য হন থেমে যেতে, কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে কিংবা অন্য কোনো পথচারীকে আগে রাস্তা পার হয়ে যেতে সুযোগ করে দিতে। যুগ যুগ ধরে এই পরিচিত ও চেনা দৃশ্যটি আমাদের সমাজের আনাচে-কানাচে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে প্রশ্নটি বরাবরই সবচেয়ে বেশি উঁকি দেয়, তা হলো—একটি সাধারণ নিরীহ প্রাণী রাস্তা পার হলে আমরা আধুনিক যুগেও এত বেশি ভয় পাই কেন? এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা আসল রহস্য বা কারণটাই বা ঠিক কী?

লোকবিশ্বাস এবং প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্রের বিভিন্ন ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিড়াল রাস্তা পার হলে সেই নির্দিষ্ট পথ দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষের ওপর নাকি সঙ্গে সঙ্গে একটি অদৃশ্য অশুভ ছায়া নেমে আসে। তবে মনে রাখা দরকার যে সব বিড়ালের ক্ষেত্রে এই ভীতি বা কুসংস্কারের মাত্রা এক নয়; বিশেষ করে কালো বিড়ালের নাম কানে আসামাত্রই মানুষের মনের গভীরে এক অদ্ভুত ভয়ের আতঙ্ক তৈরি হয়। জ্যোতিষশাস্ত্রের মতামত অনুসারে, বিড়ালকে সাধারণত রাহু এবং কেতু—এই দুটি প্রভাবশালী ছায়াগ্রহের অশুভ সংকেত বা প্রধান প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে কুখ্যাত কালো বিড়ালকে সরাসরি বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রের রাহু গ্রহের কুপ্রভাবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত বলে ধরা হয়ে থাকে। জ্যোতিষবিদদের মতে, রাহু ও কেতু হলো এমন দুটি শক্তিশালী ও মারক শক্তি, যা মানুষের সুখের জীবনে হঠাৎ করে বড় বাধা, কর্মক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতি কিংবা আকস্মিক দুর্ঘটনার অশনি সংকেত বয়ে নিয়ে আসে। তাই চলার পথে বিড়াল রাস্তা কেটে চলে গেলে অতি সহজেই এই বিশ্বাস দানা বাঁধে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর রাহু বা কেতুর কুদৃষ্টি পড়েছে। এর ফলে শুধু যে পেশাগত বা কর্মজীবনের ক্ষতি হয় তা নয়, এর জেরে পরিবারের সদস্যদের মেজাজও হঠাৎ খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে, কিংবা অকারণে অতিরিক্ত মাথা গরম করার বদঅভ্যাসও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

রাহু কিংবা কেতুর প্রভাবেই শুধু নয়, এই অদ্ভুত বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে হিন্দু সনাতন ধর্মের পৌরাণিক দেবী অলক্ষ্মীর প্রসঙ্গটিও। আমাদের সনাতন ধর্মে মা লক্ষ্মী হলেন পরম ধনসম্পদ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবী। আর তাঁর ঠিক বিপরীত রূপ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন দেবী অলক্ষ্মী, যাকে মূলত দুর্ভাগ্য, অভাব, অনটন ও চরম দারিদ্র্যের দেবী বলে গণ্য করা হয়। প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই দেবী অলক্ষ্মীর নিজস্ব বাহন বা প্রধান সওয়ারি হলো এই কালো বিড়াল। তাই প্রতিদিনের যাত্রাপথে হঠাৎ করে চোখের সামনে কালো বিড়াল চলে আসা মানেই অনেকে মনে করেন যে অলক্ষ্মীর অশুভ দৃষ্টি আপনার ওপরে এসে পড়েছে অথবা অদূর ভবিষ্যতে আপনার সামনে কোনো বিশাল বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। এ ছাড়া, বাড়ি থেকে কোনো অত্যন্ত শুভ বা ভালো কাজে বেরোনোর ঠিক প্রাক্কালে যদি কোনো বিড়াল আচমকা পথ আটকে দাঁড়ায়, তবে সেই নির্দিষ্ট কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে বহু ঝামেলা ও মানসিক চাপ পোহাতে হয় বলে সাধারণ মানুষের জোরালো বিশ্বাস রয়েছে। লোকমুখে এমন কথাও প্রচলিত আছে যে বিড়াল নাকি আমাদের চারপাশের সমস্ত ইতিবাচক বা ভালো শক্তির প্রবাহকে এক নিমিষেই সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয়। ফলস্বরূপ, যে কাজটি অত্যন্ত সহজে ও সুচারুভাবে হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা আকস্মিক নানা জটিলতায় আটকে যায় কিংবা বিনা কারণে একের পর এক বিলম্ব হতে থাকে।

শুধু রাস্তার বাইরে যাতায়াতের সময়ই নয়, ঘরের অন্দরেও বিড়ালের অবাধ যাতায়াত এবং আচরণ নিয়ে সমাজে নানা ধরনের অদ্ভুত কথা প্রচলিত আছে। জ্যোতিষশাস্ত্রের মতে, কোনো বিড়াল যদি হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই ঘরের ভেতরে এসে অনবরত কান্না বা চিৎকার করতে শুরু করে, তবে তা নাকি ভবিষ্যতে গৃহবিবাদ বা পরিবারের মানুষের মধ্যে মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝির একটি স্পষ্ট আগাম বার্তা দেয়। আবার গৃহস্থালির অন্দরে হঠাৎ করে বিড়ালের উপদ্রব ও উৎপাত মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে গেলে, কিংবা রান্নাঘরের খোলা দুধ ও অন্যান্য খাবারদাবার বারবার নষ্ট করে দিলে তাকেও দেবী অলক্ষ্মীর অশুভ প্রভাব হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, এই ধরনের ঘটনার ফলে ঘরে জমানো কষ্টে অর্জিত টাকা-পয়সা খুব দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে কিংবা কোনো বড় ধরনের মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান এই সমস্ত প্রাচীন সংস্কার ও কুসংস্কারকে এক ফুঁয়ে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেয়, তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মন থেকে আজও এই অন্ধভয়ের রেশ পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি!