লোকসভার শেষ দিনে হঠাৎ কেন উধাও স্পিকারের বিদায়ী ভাষণ? মোদী-রাহুলের উপস্থিতিতে বড় নাটক!

সংসদের বাদল অধিবেশনের শেষ দিনটি এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার লোকসভার অধিবেশন শুরু হওয়ার ঠিক প্রারম্ভে জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক একসঙ্গে বাজানো হয়। এই পবিত্র মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীসহ কক্ষের প্রায় সমস্ত সাংসদ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সসম্মানে উপস্থিত ছিলেন। ‘বন্দে মাতরম’-এর সুর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লোকসভার কার্যদিবস অনির্দিষ্টকালের জন্য (Sine Die) মুলতুবি ঘোষণা করা হয়।
সংসদীয় ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো অধিবেশনের সমাপ্তি দিনে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবক পরিবেশন করা হলো। উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই এই ঐতিহাসিক জাতীয় স্তোত্রটিকে পূর্ণ আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিলে দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু স্বাক্ষর করে নিজের সম্মতি প্রদান করেছেন। এর পাশাপাশি কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে গানটির পরিবেশন সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রোটোকল ও প্রেক্ষাপট নিয়ে কঠোর নির্দেশিকাও জারি করা হয়েছিল। নতুন এই আইন অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া আটকানো বা তার অবমাননা ও ব্যাহত করাকে একটি গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
তবে দিনের শুরুটা জাতীয় স্তোত্র দিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে হলেও, অধিবেশনের শেষ মুহূর্তটি তীব্র রাজনৈতিক টানাপড়েন ও হট্টগোলে পূর্ণ ছিল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বিরোধী দলের সাংসদদের মুহুর্মুহু স্লোগানে গোটা সংসদ চত্বরের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চরম রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এ বার তাঁর ঐতিহ্যগত ও স্বাভাবিক বিদায়ী ভাষণ পর্যন্ত দিতে পারেননি। ফলস্বরূপ, বর্তমান অধিবেশনে সংসদের সামগ্রিক কাজকর্ম, উৎপাদনশীলতা এবং সাফল্যের হিসাব তুলে ধরার চিরন্তন রীতিটি এ বার আর পালিত হতে দেখা গেল না।
গত ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ বাদল অধিবেশনের সিংহভাগ দিনই বিরোধীদের হাঙ্গামা ও প্রতিবাদের জেরে বারবার থমকে গিয়েছিল। বিশেষ করে রাজধানী দিল্লিতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্র আন্দোলনের ওপর পুলিশের অতিসক্রিয়তা এবং অযোধ্যার রাম মন্দিরের অনুদান সংক্রান্ত নানান গুরুতর অভিযোগ তুলনামূলকভাবে বিরোধীদের আলোচনার মূল এজেন্ডা হয়ে উঠেছিল। সরকারের বিরুদ্ধে একযোগে অনড় থেকে বিরোধীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সরব হওয়ায় সংসদের স্বাভাবিক আইন প্রণয়নের কাজকর্ম মার খেয়েছিল।
যদিও পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবারই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বসার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছিলেন এবং বিরোধীদের প্রতিটি প্রশ্নের যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর দেওয়ার জোরালো আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অধিবেশনের শেষ দিনেও সেই সমঝোতা বা আলোচনার পথ মসৃণ হয়নি। এদিন সংসদ চত্বরের ঐতিহাসিক মকর দ্বারের সামনে শাসকদল বিজেপি এবং বিরোধী দলগুলির সম্পূর্ণ পৃথক ও পরস্পরবিরোধী কর্মসূচি লক্ষ্য করা যায়। একদিকে যেমন বিরোধীরা নিজেদের দাবিতে অনড় থেকে দলিত প্রসঙ্গ সহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরব হন, তেমনই অন্যদিকে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে কড়া স্লোগান তোলে বিজেপি শিবির। সবমিলিয়ে, তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত এবং নজিরবিহীন নাটকীয়তার মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘটল এবারের বাদল অধিবেশনের।