মৃত্যুর মুখেও ছাড়েনি বন্ধুর হাত! মহানন্দায় তলিয়ে যাওয়া ২ ছাত্রের নিথর দেহ উদ্ধার হতেই চোখ ভিজল সবার

“মরলে একসাথেই মরব”— যেন এই প্রতিজ্ঞাই ছিল তাদের। প্রায় ৪৮ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস তল্লাশি অভিযান শেষে যখন মহানন্দা ব্যারেজ থেকে উদ্ধার হলো দুই স্কুল ছাত্রের নিথর দেহ, তখন থমকে গেলেন উদ্ধারকারীরাও। চরম বিপদের মুখেও যে তারা একে অপরের হাত ছাড়েনি, ভেসে ওঠা দুটি দেহের অবস্থানই তার নীরব সাক্ষী।
গত রবিবার বিকেলে শিলিগুড়ি লাগোয়া ফুলবাড়ির মহানন্দা ব্যারেজে স্নান করতে নেমে নদীর তীব্র স্রোতে তলিয়ে যায় ১৬ বছরের দুই কিশোর। মঙ্গলবার সকালে ব্যারেজ থেকে আনুমানিক ২০০ মিটার দূরে জাতীয় ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (NDRF & SDRF) যৌথ দল অবশেষে তাদের দেহ উদ্ধার করে।
কী ঘটেছিল সেদিন?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত দুই ছাত্রের একজন মালদার ইংরেজবাজারের বাসিন্দা প্রজ্ঞাজ্যোতি দাস এবং অন্যজন বাংলাদেশের বাসিন্দা মহম্মদ সাফায়েল হোসেন নওশাদ। দু’জনেই জটিয়াকালীর একটি নামী বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দশম শ্রেণিতে পড়ত এবং হস্টেলেই থাকত।
রবিবার পোশাক কেনার নাম করে হস্টেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মাটিগাড়ার একটি শপিং মলে গিয়েছিল তারা। সঙ্গে ছিল তাদের আরেক সহপাঠী, মেখলিগঞ্জের বাসিন্দা দিব্যাংশু সাহা। কেনাকাটা সেরে হস্টেলেই ফেরার কথা থাকলেও, তিনজনে মিলে একটি টোটো ভাড়া করে সোজা চলে যায় ফুলবাড়ি মহানন্দা ব্যারেজ ঘুরে দেখতে।
সতর্কতা উপেক্ষা করেই মর্মান্তিক পরিণতি:
ব্যারেজের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে একপর্যায়ে নদীতে নামার সিদ্ধান্ত নেয় তিন কিশোর। ব্যারেজের লক গেট খোলা থাকায় নদীতে তখন উপচে পড়া তোড়। পাড়ে থাকা স্থানীয় এক মৎস্যজীবী শঙ্কর সরকার তাদের বারবার জলে নামতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু কিশোর মন সেই সতর্কতায় কান দেয়নি।
নদীতে নামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রবল স্রোতের টানে ভেসে যেতে থাকে তিনজনই। স্থানীয়দের তৎপরতায় দিব্যাংশু কোনোমতে বেঁচে ফিরলেও, চোখের পলকে তলিয়ে যায় প্রজ্ঞাজ্যোতি ও নওশাদ।
৪৮ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযান:
খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফাঁসিদেওয়া ও এনজেপি থানার পুলিশ। রবি ও সোমবার দিনরাত এক করে এনডিআরএফ এবং এসডিআরএফের ডুবুরি দল স্পিডবোট ও দড়ি নিয়ে অভিযান চালায়। ব্যারেজটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় দেহ ওপারে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। অবশেষে মঙ্গলবার সকালে ব্যারেজের কাছেই পাশাপাশি ভেসে ওঠে দুটি মরদেহ। পুলিশ দেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় দুই পরিবার তো বটেই, শোকে পাথর পুরো স্কুল ও সহপাঠীরা।