লাদাখের রিয়েল লাইভ ‘ফুনসুক ওয়াংডু’ আসলে কতদূর পড়েছেন জানেন? তাক লাগিয়ে দেবে সোনম ওয়াংচুকের শিক্ষাগত যোগ্যতা!

লাদাখের দূরদর্শী সমাজসংস্কারক, বিখ্যাত উদ্ভাবক এবং বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুককে (Sonam Wangchuk) আজ সারা বিশ্ব এক নামে চেনে। শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার থেকে শুরু করে অভিনব বরফের স্তূপ বা ‘আইস স্টুপা’ (Ice Stupa) বানিয়ে পাহাড়ের তীব্র জলের সংকট মেটানো—তাঁর প্রতিটি যুগান্তকারী কাজই বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই একটি কৌতূহল জাগে যে, যে মানুষটি গোটা লাদাখের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক বিরাট জোয়ার এনেছেন, তাঁর নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ঠিক কতটা? আসুন, এক নজরে জেনে নেওয়া যাক তাঁর বর্ণময় পড়াশোনা ও জীবনসংগ্রামের বিস্তারিত তথ্য।

জানা গিয়েছে, সোনম ওয়াংচুকের জন্ম ১৯৬৬ সালে লাদাখের আলচির কাছে এক অত্যন্ত প্রত্যন্ত গ্রামে। সেই সময়ে তাঁর জন্মভিটে বা আশপাশে কোনো স্কুলই ছিল না। ফলে জীবনের প্রথম ৯ বছর পর্যন্ত তিনি কোনো প্রথাগত বিদ্যালয়ে পড়াশুনার সুযোগ পাননি। এই প্রাথমিক সময়টায় তাঁর মা শেরিং ওয়াংমো নিজের মাতৃভাষাতেই তাঁকে জীবনের প্রথম অক্ষর চেনা ও শিক্ষার বুনিয়াদী পাঠ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে তাঁর বাবা জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতিতে যুক্ত হলে সোনমকে শ্রীনগরে নিয়ে গিয়ে একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা ও অচেনা পরিবেশে মানিয়ে নিতে তাঁর চরম কষ্ট হয়েছিল। এরপর তিনি নিজেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে দিল্লিতে চলে আসেন এবং দিল্লির ‘বিশেষ কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়’ (Kendriya Vidyalaya) থেকে তাঁর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাঠ সফলভাবে সম্পন্ন করেন। বলা বাহুল্য, সেই সময় কাশ্মীর থেকে সোনম নিজেই একা একা দিল্লি এসে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে ভরতি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান।

স্কুলের গণ্ডি পার করার পর তিনি প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চ্যালেঞ্জিং ক্ষেত্র বেছে নেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার ঝুলিতে রয়েছে সম্মানজনক বি.টেক (B.Tech in Mechanical Engineering) ডিগ্রি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (NIT), শ্রীনগর থেকে ১৯৮৭ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.টেক ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেন সোনম। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি; এরপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ফ্রান্সে পাড়ি জমান। ইঞ্জিনিয়ারিং পাসের পর প্রথাগত কোনো চাকুরির পেছনে না ছুটে তিনি লাদাখের চরম জলবায়ুর উপযোগী ঘরবাড়ির টেকসই নকশা তৈরি করতে মনোনিবেশ করেন। ২০১১ সালে তিনি ফ্রান্সের গ্রেনোবলের বিখ্যাত ‘ক্রাটের আর্কিটেকচার স্কুল’ (CRATerre School of Architecture, France) থেকে আর্থ আর্কিটেকচার (Earthen Architecture) বা মাটির স্থাপত্যবিদ্যায় দুই বছরের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

সোনম ওয়াংচুকের শিক্ষাগত যোগ্যতার ঝুলিতে শুধু কারিগরি ডিগ্রিই নয়, রয়েছে আন্তর্জাতিক মাপের মর্যাদাপূর্ণ সম্মানও। ২০১৮ সালে পুণের বিখ্যাত সিমবায়োসিস ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (Symbiosis International University) তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট (Doctorate of Literature – Honoris Causa) উপাধিতে ভূষিত করে। শিক্ষা ও পরিবেশ রক্ষায় অবদানের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রমন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০১৮) এবং রোলেক্স অ্যাওয়ার্ড ফর এন্টারপ্রাইজ (২০১৬)-এর মতো বহু পুরস্কার লাভ করেছেন।

এদিকে বর্তমানে তাঁর অনশন ও স্বাস্থ্য নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন চর্চা। নিট-ইউজি পরীক্ষার অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোরালো প্রতিবাদে সোনম ওয়াংচুক অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসেছিলেন। গত শনিবার সকালে দিল্লি পুলিশ তাঁকে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যায়। এরপর পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুককে সফদরজং হাসপাতাল থেকে তাঁর পছন্দের বেসরকারি হাসপাতাল মেদান্তায় অবিলম্বে স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ওয়াংচুককে মেদান্তা হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নির্ধারিত চিকিৎসার নিয়মকানুন ও পরামর্শ অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।