রাত ৩টেয় আর রিলস নয়! কিশোরদের জন্য ‘ডিজিটাল নাইট কার্ফু’ আনতে চলেছে UK সরকার।

স্মার্টফোনের নীল আলোয় রাত জাগা এবং রাত ৩টে পর্যন্ত একটানা সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস স্ক্রল করা—যুক্তরাজ্যের ১৬-১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের দৈনন্দিন রুটিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই আপাত ‘স্বাভাবিক’ অভ্যাসটিই এখন সে দেশের তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবথেকে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনএইচএস (NHS)-এর সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বলছে, যুক্তরাজ্যের ৬৫ শতাংশেরও বেশি কিশোর-কিশোরী সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে প্রতি রাতে গড়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা প্রয়োজনীয় ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই অপর্যাপ্ত ঘুম সরাসরি প্রভাব ফেলছে তাদের মনোযোগের ক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং চূড়ান্ত একাডেমিক ফলাফলের ওপর। ডিপ্রেশন এবং উদ্বেগের মতো সমস্যাগুলোর মূলে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই সংকট মোকাবিলায় ব্রিটিশ সরকার এবার এক ঐতিহাসিক ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পথে হাঁটছে। প্রস্তাব করা হয়েছে ‘ডিজিটাল নাইট কার্ফু’ (Digital Night Curfew)-এর। এই নিয়ম কার্যকর হলে রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ১৬-১৭ বছর বয়সীদের জন্য ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও এক্স (X)-এর মতো জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, রাত ১০টার পর অ্যাপগুলো খোলা থাকলেও সেখানে কোনো নতুন নোটিফিকেশন আসবে না এবং কোনো নতুন পোস্ট বা ভিডিও লোড হবে না। তবে অভিভাবকদের বিশেষ অনুমতি থাকলে এই সময়সীমা সর্বোচ্চ রাত ১২টা পর্যন্ত শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে: প্রথমত, রাত জেগে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ফলে কিশোরদের ঘুমের মান মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা স্কুলে তাদের মনোযোগের অভাব ঘটাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, গভীর রাতে সাইবার বুলিং এবং অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতা বাড়ে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করছে। তৃতীয়ত, এ-লেভেল বা সমমানের পরীক্ষার আগে পড়াশোনায় ফোকাস ধরে রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। যুক্তরাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর কথায়, “আমরা প্রযুক্তির বিরোধী নই, তবে আমরা চাই না প্রযুক্তি আমাদের সন্তানদের জীবন এবং ভবিষ্যৎ কেড়ে নিক।”

এই নিয়মের পাশাপাশি প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে আরও কড়া ‘এজ ভেরিফিকেশন টুল’ বা বয়স যাচাইকরণ প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মেটা, বাইটড্যান্স-এর মতো সংস্থাগুলো ‘ওয়েলবিং মোড’ আনার প্রস্তাব দিলেও সরকার তাদের পুরোপুরি ‘নাইট লক’ সিস্টেম কার্যকর করার পক্ষে অনড়।

অভিভাবকরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। অনেক অভিভাবকের মতে, ব্যক্তিগতভাবে ফোন কেড়ে নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে, কিন্তু সরকারি নিয়ম থাকলে তা কঠোরভাবে পালন করা সহজ হবে। অন্যদিকে, কিশোর-কিশোরীদের একাংশ একে তাদের ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ’ বলে দাবি করেছে। তবে মনোবিদদের মতে, শুরুতে এই নিয়ম নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হলেও দুই-তিন মাসের মধ্যে এটি একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে পরিণত হবে। সোশ্যাল মিডিয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়, কিন্তু রাতটা ঘুমের জন্য—এই বার্তাটিই তরুণ প্রজন্মের মাথায় গেঁথে দিতে চাইছে যুক্তরাজ্য সরকার।