বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে অভাবনীয় পালাবদলের পর এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সাক্ষী থাকছে রাজ্য রাজনীতি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি সরকার গঠনের পথে থাকলেও, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগ করবেন না। তৃণমূল সুপ্রিমোর এই অনড় অবস্থানের পর প্রশ্ন উঠছে—তবে কি বাংলায় তৈরি হতে চলেছে সাংবিধানিক সংকট? বাধা আসবে কি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণে?
বিস্ফোরক মমতা: মঙ্গলবার কালীঘাটে সংবাদিক বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, তৃণমূল হারেনি, বরং ১০০টি আসন লুঠ করে জোর করে তাদের হারানো হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমি রাজভবন কেন যাব? জোর করে দখল করে কেউ যদি ভাবে আমাকে গিয়ে পদত্যাগ করতে হবে, সেটা হবে না।” সাধারণত নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের কাছে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা এক দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রীতি। কিন্তু সেই রীতি মানতে অস্বীকার করেছেন মমতা।
কী বলছেন আইন বিশেষজ্ঞরা? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্তে কি প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হবে? এই বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি দেবাশিস করগুপ্ত। তাঁর মতে, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ না করলেও নতুন সরকার গঠনে কোনো আইনি বাধা নেই।
বিচারপতি করগুপ্ত সংবিধানের ১৬৪ নম্বর ধারা উল্লেখ করে জানান:
রাজ্যপাল যতদিন চাইবেন, মুখ্যমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভা ততদিনই পদে থাকতে পারেন।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর জয়ী প্রার্থীদের তালিকা যখন নির্বাচন কমিশন রাজ্যপালের কাছে জমা দেয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠনের দাবি জানায়, তখন পুরনো সরকারের মেয়াদ কার্যত শেষ হয়ে যায়।
রীতি অনুযায়ী রাজ্যপাল বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ না নেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব সামলানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী যদি পদত্যাগ না করেন, তবে রাজ্যপাল নিজে থেকেই মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
রাজ্যপালের হাতে কোন ক্ষমতা? অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আরও স্পষ্ট করেন যে, যদি সরকারিভাবে পদত্যাগপত্র না আসে, তবে রাজ্যপাল সরাসরি নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে পারেন। সেই কয়েক দিনের অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য তিনি প্রশাসন নিজের হাতে নিতে পারেন অথবা বর্তমান প্রশাসনকেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্তফা না দিলেও রাজ্যে কোনো বড় ধরনের সাংবিধানিক সংকট তৈরির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অবস্থান আসলে একটি বড়সড় ‘রাজনৈতিক প্রতিবাদ’। তবে আইনি পথে এটি নতুন সরকারের পথ চলা আটকাতে পারবে না। এখন দেখার, রাজভবন এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে।





