ব্যবসার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকার পুঁজি লাগে— এই ধারণাটি বদলে দিয়েছেন উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের এক সাধারণ গৃহবধূ। সামান্য কাদা মাটি আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি তৈরি করছেন এমন এক সামগ্রী, যা দেখে এবং শুনে তাজ্জব বনে যাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রায়গঞ্জের বীরঘই এলাকার বাসনা সরকার এখন এলাকার মহিলাদের কাছে স্বনির্ভরতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ছোটবেলার গল্প থেকেই শুরু
বাসনাদেবী জানান, ছোটবেলায় বড়দের মুখে শুনেছিলেন ‘মাটির তৈরি শঙ্খও বাজে’। সেই কথাটিই তাঁর মনে গেঁথে গিয়েছিল। আজ থেকে বছর দুয়েক আগে শখের বশেই মাটি দিয়ে শঙ্খ তৈরির চেষ্টা শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই শখই এখন পেশায় পরিণত হয়েছে। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ পাওয়া মাটির শঙ্খ এখন শুধু ঘর সাজানোর শোপিস নয়, বরং পুরোদস্তুর বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নির্মাণ কৌশল: রোদ আর আগুনের লড়াই
মাটির এই অভিনব শঙ্খ তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ পরিশ্রমের। বাসনাদেবী জানান:
প্রথমে বিশেষ ধরণের মাটি দিয়ে নিপুণভাবে শঙ্খের আকার তৈরি করা হয়।
এরপর দীর্ঘক্ষণ রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয় কাঁচা মাটির সেই অবয়ব।
শুকিয়ে গেলে কাঠকয়লার আগুনে তা পুড়িয়ে পাথর শক্ত করা হয়।
সবশেষে উজ্জ্বল রং দিয়ে সেটিকে আসল শঙ্খের মতো আকর্ষণীয় করে বাজারে বিক্রি করা হয়।
আসল শঙ্খের মতো আওয়াজ
বাসনাদেবীর দাবি, এই শঙ্খগুলি দেখতে যতটা সুন্দর, এগুলোর আওয়াজও ততটাই গম্ভীর ও সুললিত। যেহেতু এগুলি পোড়া মাটি দিয়ে তৈরি, তাই এগুলি নষ্ট হওয়ার ভয় নেই। এমনকি জল দিয়ে ধুলে এই শঙ্খের শব্দ আরও বাড়ে বলে জানান তিনি। মাটির জিনিসের এমন স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা দেখে রীতিমতো অবাক ক্রেতারাও।
স্বনির্ভরতার নতুন দিশা
মোটা টাকা পুঁজির অভাবে যারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছেন না, তাঁদের জন্য বাসনা সরকার এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা। ঘরে বসেই খুব সামান্য বিনিয়োগে কীভাবে সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে উপার্জন করা যায়, তা তিনি হাতে-কলমে প্রমাণ করে দিয়েছেন।
শহরের কোলাহল ছাপিয়ে রায়গঞ্জের এই গ্রামীন শিল্পীর ‘হাতের জাদু’ এখন ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। বাসনাদেবীর এই মাটির শঙ্খ কেবল তাঁর সংসারে সচ্ছলতা আনেনি, বরং বাংলার হারিয়ে যাওয়া মৃৎশিল্পে যোগ করেছে এক আধুনিক মাত্রা।





